একটা জয়, ঘুঁচে গেল চোকার্স, লেখা হলো ইতিহাস!

নিউজ ক্রিকেট ২৪ ডেস্ক »

শুনেছি একজন কর্মঠ মানুষের রাতের শেষ প্রহরের ঘুমের গভীরতা আছে, তবে কতটা ঘুমালে একজন অলস মানুষের মাঝেও বিরক্ত এসে যায়? কতটা মরুপথ পার হলে একটু জলের দেখা পাওয়া যায়, কতটা পুড়লে সোনা খাঁটি হয়? কতটা ধৈর্য ধরলে একজন মানুষ নিজের সাফল্য খুঁজে পায়? কতটা নিখুঁত কারিগর হলে রং আর তুলির আচরে মোনালিসা আঁকা যায়। কতটা অভিনয় জানলে একজন শেকসপিয়ার হওয়া যায়?

এতকিছুর উত্তর হয়তো একসাথে দেয়া সম্ভব নয়, তবে বেশ কিছু কাঠফাটা গ্রীষ্ম কাটিয়ে সাউথ আফ্রিকা ক্রিকেট আকাশে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে আসল একটা জয়,জ্যাক ক্যালিস, গ্রায়েম স্মিথ, আমলা ডি ভিলিয়ার্স, স্টেইন, মরকেলরা যা করতে পারেন নি তা করে দেখালেন বাভুমা, মারক্রাম, রাবাদা, জ্যানসন, লুঙ্গি এনগিডিরা। এবার আর উত্তাপ্ত সূর্যের তাপদাহে পুড়তে হয়নি তাদের। সুখের বৃষ্টিতে ভিজে গেল নেলসন ম্যান্ডেলার সাউথ আফ্রিকা।

টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল সাউথ আফ্রিকার প্রতিপক্ষ অষ্ট্রেলিয়া। প্রতিপক্ষ বিবেচনায় অষ্ট্রেলিয়া এগিয়ে থাকলেও টানা ৮ ম্যাচ অপরাজিত থাকা সাউথ আফ্রিকার এগেনেস্টে বলার সাহস ছিল না কারো। কেননা টেম্বা বাভুমার দলটা রীতিমতো উড়তে ছিল। তাই এবার তাদেরকে নিয়ে বড় স্বপ্ন ছিল সবার। তবে ফাইনালে এসে কিছুটা হলেও সেই স্বপ্ন ফিকে হয়ে যেতে থাকে প্রথম ইনিংসে সাউথ আফ্রিকার ব্যাটিং বিপর্যয়ের কারনে। তবে দ্বিতীয় ইনিংসে ২৮২ রানের বিশাল টাড়গেট তারা করে ৫ উইকেটে ম্যাচ জিতে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করলো সাউথ আফ্রিকা।

চতুর্থ ইনিংসে অষ্ট্রেলিয়ার দেওয়া ২৮২ রানের টার্গেটে খেলতে নেমে দলীয় ৯ রানের মাথায় স্টার্কের সোবলে রায়ান রিকেলটনকে হারায় সাউথ আফ্রিকার। এরপর শুরুর বিপর্যয় সামাল দেন এইডেন মারক্রাম এবং ওয়াইন মুল্ডার। ৫০ বলে ২৭ রানে স্টার্কের দ্বিতীয় শিকার হয়ে আউট হন মুল্টার।প্রথম ইনিংসে ০ রানে আউট হওয়া এইডেন মারক্রাম যেন নিজেকে জমিয়ে রেখেছিলেন দ্বিতীয় ইনিংসের জন্য। ওপেনিংয়ে নেমে সাবধানি ব্যাটিংয়ে নিজের এবং দলীয় ইনিংসটাকে গুছিয়ে নেন মারক্রাম।

তৃতীয় উইকেটে অধিনায়ক টেম্বা বাভুমাকে নিয়ে প্রতিরোধ গড়েন মারক্রাম।৬৯ বলে ব্যাক্তিগত হাফ সেঞ্চুরি পূরন করেন এবং সাউথ আফ্রিকাকে ১০০ রানের সংগ্রহ এনে দেন মারক্রাম। এদিন নিজেকে যেন শান্ত রাখতেই বেশি মনযোগী ছিলেন মারক্রাম। অপর প্রান্ত থেকে দূর্দান্ত ব্যাটিং করতে থাকেন দলীয় অধিনায়ক টেম্বা বাভুমা। দুজনে মিলে অষ্ট্রেলিয়ার হাত থেকে ম্যাচটাকে বের করে আনেন। ৮৩ বলে হাফ সেঞ্চুরি পূরন করেন বাভুমা। ১৫৬ বলে সেঞ্চুরি পূরন করেন মারক্রাম। মাত্র ৬৯ রানে পিছিয়ে থেকে তৃতীয় দিন শেষ করেন তারা।

চতুর্থ দিনে শুরুতেই বাভুমাকে ৬৬(১৩৪) হারালেও জয়ের জন্য ব্যাগ পেতে হয়নি সাউথ আফ্রিকাকে। এক প্রান্ত আগলে রেখে ২০৭ বলে ১৩৬ রানের ইনিংস খেলে জয় থেকে মাত্র ৬ রান দূরে থেকে আউট হন মারক্রাম। স্টুবাস ৮(৪৩), বেডিংহাম ২১*(৪৯) এবং এবং কাইল ভারানে ৪*(১৩) রানের ইনিংসে ভর করে ৫ উইকেট হারিয়ে সহজ জয় তুলে নেয় সাউথ আফ্রিকা। অষ্ট্রেলিয়ার হয়ে ৬৬ রানে ৩ উইকেট নেন মিচেল স্টার্ক, ৫৮ রানে ১ উইকেট শিকার করেন প্যাট কামিন্স এবং ৫৯ রানে ১ উইকেট শিকার করেন জশ হ্যাজলউড।

অবশ্য টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে সাউথ আফ্রিকা শুভ সূচনা করেছিল টস জয়ের মধ্যে দিয়েই।এরপর ইনিংসের শুরুতেই সাউথ আফ্রিকান বোলারদের তোপের মুখে পরে অষ্ট্রেলিয়া। ইনিংসে ৭ম ওভারের তৃতীয় বলে দলীয় ১২ রানের মাথায় ওপেনার উসমান খাজাকে ০(২০) ফিরিয়ে দেন কাগিসো রাবাদা, একই ওভারে শেষ বলে ক্যামেরুন গ্রীনকে ৪(৩) ফিরিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো অষ্ট্রেলিয়া ইনিংসে আঘাত হানেন রাবাদা।

এরপর কিছুটা ইনিংস গুছিয়ে নেয় অষ্ট্রেলিয়া। মার্নাস ল্যাবুশানে এবং স্টিভেন স্মিথ মিলে তৃতীয় উইকেটে ৩০ রানের পার্টনারশিপ গড়েন। এরপর অষ্ট্রেলিয়া শিবিরে আঘাত হানেন মার্কো জ্যানসন। মার্নাস ল্যাবুশানেকে ১৭(৫৬) রানে ফিরিয়ে দেন।এরপর ট্রাভিস হেডকে ১১(১৩) ফিরিয়ে নিজেনিজের দ্বিতীয় উইকেট তুলে নেন জ্যানসন। ৬৭ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বিপদে পরে অষ্ট্রেলিয়া। সেখান থেকে দলকে টেনে তোলেন স্টিভেন স্মিথ এবং বিউ ওয়েবস্টার। স্মিথ এবং ওয়েবস্টার ৫ম উইকেট জুটিতে মহামূল্যবান ৭৯ রান যোগ করেন। স্মিথকে ফেরান মারক্রাম। ১১২ বলে ১০ চারের সাহায্যে ৬৬ রান করেন স্মিথ।

এরপর বিউ ওয়েবস্টার ৭২(৯২) ফেরান কাগিসো রাবাদা, ২৩(৩১) করা অ্যালেক্স ক্যারিকে ফেরান কেশব মহারাজ। প্যাট কামিন্স এবং মিচেল স্টার্কে ফিরিয়ে ফাইফার পূর্ণ করেন রাবাদা। নিষেধাজ্ঞা থেকে ফিরেই সাউথ আফ্রিকার হয়ে জ্বলে ওঠেন এই পেসার। তাকে যোগ্য সঙ্গ দেন জ্যানসন। প্রথম ইনিংসে মাত্র ২১২ রানে অলআউট হয় অষ্ট্রেলিয়া দলের হয়ে ৪৯ রানে ৩ উইকেট নেন মার্কো জ্যানসন। ১৯ রানে ১ উইকেট নেন মহারাজ এবং মাত্র ৫ রানে ১ উইকেট নেন মারক্রাম। বোলিং ফিগার রাবাদা ১৫.৪-৫-৫১-৫, জ্যানসন ১৪-৫-৪৯-৩, মহারাজ ৬-০-১৯-১, মারক্রাম ২-০-৫-১, লুঙ্গি ৮-০-৪৫-০।

অষ্ট্রেলিয়ার দেওয়া ২১২ রানের লীডের বিপরীতে খেলতে নেমে ইনিংসে শুরু থেকেই ব্যাটিং বিপর্যয়ে পরে সাউথ আফ্রিকা। ইনিংসের প্রথম ওভারেই মিচেল স্টার্কের দূর্দান্ত এক ডেলিভারিতে ক্লিন বোল্ড হয়ে ফেরেন এইডেন মারক্রাম ০(৬)। এই শুরু এরপর তার দেখানো পথে হাঁটেন রায়ান রিকেলটন ১৬(২৩), ওয়াইন মুল্ডার ৬(৪৪), ট্রিস্টান স্টুবাস ২(১৩)। মাত্র ৩০ রানেই ৪ উইকেট হারিয়ে ফেলে সাউথ আফ্রিকা। তখন মনে হচ্ছিল সাউথ আফ্রিকা আরও একবার হোঁচট খেতে চলছে। এরপর কিছুটা প্রতিরোধ গড়েন টেম্বা বাভুমা এবং ডেভিড বেডিংহাম। দুজনে ৬৪ রানে জুটি গড়েন। টেম্বা বাভুমাকে ৩৬(৮৪) ফিরিয়ে সেই জুটি ভাঙেন প্যাট কামিন্স।

এরপর ফের নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারায় সাউথ আফ্রিকা। কাইল ভারানে ১৩(৩৯), মার্কো জ্যানসন ০(৩), মহারাজ ৭(১৫)। দলের হয়ে সর্বোচ্চ ১১১ বলে ৪৫ রানের ইনিংস খেলেন বেডিহাম। সাউথ আফ্রিকা থামে ১৩৮ রানে। অষ্ট্রেলিয়া ৭৪ রানের বড় লিট পায়। অষ্ট্রেলিয়ার হয়ে বল হাতে ২৮ রানে ৬ উইকেট নেন প্যাট কামিন্স, ৪১ রানে ২ উইকেট নেন মিচেল স্টার্ক। বোলিং ফিগার, প্যাট কামিন্স ১৮.১-৬-২৮-৬, মিচেল স্টার্ক ১৩-৩-৪২-২, জশ হ্যাজলউড ১৫-৫-২৭-১।

প্রথম ইনিংসে ৭৪ রানের লিড দিয়ে দ্বিতীয় ইনিংস শুরুর করা অষ্ট্রেলিয়া মাত্র ৭৩ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে ফেলে অষ্ট্রেলিয়া। একে একে ব্যর্থ হন খাজা, গ্রিন, ল্যাবুশানে, স্মিথ, ওয়েবস্টার, হেড এবং প্যাট কামিন্স । এরপর কিছুটা প্রতিরোধ গড়েন অ্যালেক্স ক্যারি।মিচেল স্টার্ককে সঙ্গে নিয়ে ৬১ রানের জুটি গড়েন ক্যারি। ৫০ বলে ৪৩ রান করে ক্যারি যখন ফেরেন অষ্ট্রেলিয়ার রান তখন ১৩৪/৮। অষ্ট্রেলিয়া ২০৮ রানের লিড পায়। এরপর দলের হয়ে সব দায়িত্ব যেন একাই নিজের কাঁধে তুলে নেন মিচেল স্টার্ক। এদিন ব্যাট হাতে দলের সেরা ব্যাটসম্যান হয়ে ওঠেন তিনি।

১৩৬ বলে ৫ চারের সাহায্য ৫৮ রানের ইনিংস খেলেন স্টার্ক। জশ হ্যাজলউডকে নিয়ে ১০ উইকেট ৫৯ রানের জুটি গড়েন স্টার্ক। যেখানে জশের অবদান ছিল ১৭(৫৩)। অষ্ট্রেলিয়া অলআউট হয় ২০৭ রানে। সাউথ আফ্রিকার লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়ায় ২৮২ রান। সাউথ আফ্রিকার হয়ে বল হাতে এই ইনিংসেও আগুন ঝড়ান কাগিসো রাবাদা। ৫৯ রানে ৪ উইকেট নেন রাবাদা এবং ৩৮ রানে ৩ উইকেট নেন লুঙ্গি এনগিডি। বোলিং ফিগার কাগিসো রাবাদা ১৮-১-৫৯-৪, লুঙ্গি ১৩-১-৩৮-৩, জ্যানসন ১৮-৩-৫৮-১, মুল্ডার ৮-১-১৮-১, মারক্রাম ২-১-৫-১।

সংক্ষিপ্ত স্কোর :
প্রথম ইনিংস
অষ্ট্রেলিয়া ২১২/১০( ৫৬.৪ ওভার)
সাউথ আফ্রিকা ১৩৮/১০( ৫১.১ ওভার)
দ্বিতীয় ইনিংস
অষ্ট্রেলিয়া ২০৭/১০( ৬৫ ওভার)
সাউথ আফ্রিকার ২৮২/৫(৮৩.৪ ওভার)
# ম্যাচ জয়ী সাউথ আফ্রিকা ৫ উইকেটে।
# ম্যান অফ দ্য ফাইনাল এইডেন মারক্রাম।

নিউজটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »