নিউজ ক্রিকেট ২৪ ডেস্ক »
ব্রেন্ডন রস মারে টেলর! জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের নক্ষত্র গুলোর মাঝে সর্বাধিক উজ্জ্বল ও জ্বল জ্বল করে জ্বলতে থাকা নক্ষত্রটির নাম। ছোট দেশের বড় এই মহাতারকার ক্রিকেট অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে আজ।আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৭ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সমাপ্তিরেখা টেনে, আজ আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ ওয়ানডে ম্যাচ দিয়ে নিজের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছেন জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের এই জীবন্ত কিংবদন্তী।
গতকাল নিজের ইনিস্ট্রাগ্রাম একাউন্ট হতে অগ্রিম নিজের অবসরের বার্তা দিয়ে রেখেছিলেন টেলর। নিজের অফিশিয়াল ইনিস্ট্রাগ্রামে নিজের বিদায়ী বার্তায় টেলর লিখেন: ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমি জানাচ্ছি যে আগামীকাল (১৩ সেপ্টেম্বর) দেশের হয়ে আমি নিজের শেষ ম্যাচ খেলবো। ১৭ বছর ধরে প্রচুর চড়াই উতরাই দেখেছি আমি, যা আমাকে বিনয়ী হতে শিখিয়েছে। বরাবরই আমার লক্ষ্য ছিল ২০০৪ সালে আমি যখন খেলা শুরু করি তখন জিম্বাবুয়ে যে অবস্থায় ছিল,ক্যারিয়ার শেষ করার আগে তার থেকে ভাল জায়গায় দলকে পৌঁছে দেওয়া। আশা করছি আমি তা করতে পেরেছি।
১৯৮৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জিম্বাবুয়ের রাজধানী হারারেতে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন “ব্রেন্ডন রস মারে টেলর”। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি সীমাহীন নেশা ছিল টেলরের। নিজেকে ভাগ্যবান ভাবতেই পারেন তিনি! ক্রিকেটের প্রতি ছেলের এমন আসক্তি দেখে, ছোটবেলায় স্কুল ক্রিকেট থেকে শুরু করে, জাতীয় দলে অভিষেকের আগ আব্দী পরিবারের সর্বোচ্চ সমর্থন পেয়েছেন টেলর। পরিবারের মানুষ গুলোর সমর্থন, ও নিজের কঠোর অধ্যবসায়ে নিজেকে তিলে তিলে তৈরি করেছেন তিনি, শুধুমাত্র নিজের দেশকে কিছু দেওয়ার জন্য। নিজের বিদায়ী বার্তায় টেলর বলেছেন, ক্যারিয়ারের শুরুর লগ্ন থেকে জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটকে কিছু দেওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর। টেলর নিজের কথা রেখেছেন, নিজের স্বপ্নকে সত্যি করেছেন, টেলর দিয়েছেন জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটকে দুহাত ভরে। জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট ইতিহাসের একজন মহানায়ক হয়ে থাকবেন তিনি এতে কোন সন্দেহ নেই। জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটে এমন একজন প্রতিভা আবার কবে আসবে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অপেক্ষা করতে হবে আরো বহুদিন।
জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের এই পোস্টারবয় পুরো ক্রিকেট ক্যারিয়ার জুড়ে দুহাত ভরে দিয়ে গেছেন জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটকে।১৭ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে নিজ হাতে জিম্বাবুইয়ান ক্রিকেটে এমন অনেক আনন্দের গল্প রচনা করে গেছেন, যার জন্য ছোট দেশের এই মহা তারকাকে মনে রাখবে জিম্বাবুয়ে সহ পুরো ক্রিকেট বিশ্ব।
জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটে নেহাত কম ইতিহাস রচনা করেননি তিনি। তবুও শেষ দিকে অনন্য দুই রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে সেই সুযোগ লুপে না নিয়ে এইভাবে হুটহাট অবসরের ঘোষণা অবাক করেছে সবাইকে। ওয়ানডে ফরম্যাটে আর মাত্র ১০৩ রান প্রয়োজন ছিল টেলরের। আর মাত্র ১০৩ রান করলেই স্বদেশী এন্ড্রু ফ্লাওয়ারকে টপকে ওয়ানডে ফরম্যাটে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বাধিক রানের মালিক বণে যেতেন টেলর। শুধু তাই নয়! আর মাত্র ৬২ রান প্রয়োজন ছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০ হাজার রানের এলিট ক্লাবে নিজের নাম উঠানোর জন্য। অনন্য দুটি রেকর্ডের সামনে গিয়েও নিজের মুকুটে এই দুটি রেকর্ড পালক যুক্ত করা হয়নি টেলরের। টেলর চাইলে হয়তো পারতেন আরো একটি সিরিজ দেশের হয়ে খেলতে, আর অনন্য এই রেকর্ড গুলো নিজের করে নিতে। দেশের হয়ে অনন্য এই রেকর্ড গুলো টেলর নামের এই কিংবদন্তির নামের পাশেই হয়তো সুন্দর দেখাতো।
বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকেই টেলর ছিলেন বারুদে ঠাসা এক প্রতিভা। বাইশ গজে নিজের দুর্দান্ত প্রতিভার সাক্ষর রেখে, বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের প্রতিটি ইভেন্টে বাজিমাত করে, মাত্র ১৮ বছর বয়সে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ানোর গৌরব অর্জন করেন জিম্বাবুইয়ান এই পোস্টারবয়।২০০৪ সালে টগবগে এক তরুন জিম্বাবুয়ের জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মঞ্চে পা রেখেছিলেন। তখন কেই বা জানতো ১৮ বছরের এই পুচকে শেতাঙ্গ ছেলেটা পরবর্তী দেড় যুগ জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের নিউক্লিয়াস হয়ে বাইশ গজ ধাপিয়ে বেড়াবে! টেলর নিজের জাত চিনিয়েছেন, ব্যাট হাতে রানের ফুলঝুরি ফুটিয়েছেন! গ্লাভস হাতে বিশ্বস্ত প্রহরী হয়ে সামলেছেন উইকেটের পিছনটা, দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সবকটি ফরম্যাটে। জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সফল অধিনায়কদের ছোট্ট তালিকায় থাকবে ব্র্যান্ডেন টেলরের নাম।
- এক নজরে “ব্রেন্ডন রস মারে টেলরের” ক্রিকেট ক্যারিয়ারের চম্বুকাংশঃ
টেস্ট ক্যারিয়ার: ২০০৪ সালের ৬ই মে নিজ শহর হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সাদা পোশাকে জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক হয় ব্রেন্ডন টেলরের।১৭ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারে দেশের হয়ে টেস্ট ফরম্যাটে ৩৪ ম্যাচ খেলেছেন তিনি। ৩৪ ম্যাচে ৬৮ ইনিংসে ৩৬.২৫ গড়ে ব্যাট হাতে রান তুলেছেন ২৩২০। সাদা পোশাকে টেলরের ক্যারিয়ার সেরা ইনিংসটি ছিল ১৭১ রানের। এই ফরম্যাটে ১২ টি অর্ধশতকের পাশাপাশি ৬টি শতক হাঁকানোর কীর্তি রয়েছে টেলরের। এছাড়া এই ফরম্যাটে টেলরের ব্যাট ছুঁয়ে এসেছে ২৫৪টি বাউন্ডারি ও ২২টি ওভার বাউন্ডারি।
ওয়ানডে ক্যারিয়ার: ২০০৪ সালের ২০ এপ্রিল জিম্বাবুয়ের কুইন্স স্পোর্টস ক্লাব মাঠে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে রঙিন পোশাকে ওয়ানডে ফরম্যাটে প্রথমবারের মতো জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক হয় ব্রেন্ডন টেলরের।১৭ বছরের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে দেশের হয়ে ওয়ানডে ফরম্যাটে ২০৫ ম্যাচ খেলেছেন তিনি। ২০৫ ম্যাচে ২০৩ ইনিংসে ৩৫.৫৫ গড়ে ব্যাট হাতে রান তুলেছেন ৬৬৮৪। এই ফরম্যাটে টেলরের ক্যারিয়ার সেরা ইনিংসটি ছিল ১৪৫ রানের।ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ৩৯টি অর্ধশতকের পাশাপাশি ১১টি শতক হাঁকানোর কীর্তি রয়েছে টেলরের। এছাড়া এই ফরম্যাটে টেলরের ব্যাট ছুঁয়ে এসেছে ৫৯৯টি বাউন্ডারি ও ১০৬টি ওভার বাউন্ডারি।
টি-টুয়েন্টি ক্যারিয়ার:২০০৬ সালের ২৮ নভেম্বর বাংলাদেশের খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে স্বাগতিক বাংলাদেসগের বিপক্ষে রঙিন পোশাকের টি-টিয়েন্টি ফরম্যাটে প্রথমবারের মতো জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক হয় ব্রেন্ডন টেলরের।১৭ বছরের টি-টুয়েন্টি ক্যারিয়ারে দেশের হয়ে এই ফরম্যাটে ৪৪ ম্যাচ খেলেছেন তিনি।৪৪ ম্যাচে ৪৪ ইনিংসে ২২.০৩ এভারেজে ব্যাট হাতে রান তুলেছেন ৮৫৯। এই ফরম্যাটে টেলরের ক্যারিয়ার সেরা ইনিংসটি ছিল ৬০ রানের।টি-টিয়েন্টি ক্যারিয়ারে ৫ টি অর্ধশতকের দেখা পেলেও শতক হাকানোর স্বপ্ন পূরন হয়নি এই ক্রিকেটারের।এই ফরম্যাটে টেলরের ব্যাট ছুঁয়ে এসেছে ৮৭টি বাউন্ডারি ও ২১টি ওভার বাউন্ডারি।
ব্রেন্ডন টেলরের বিদায়ের মধ্য দিয়ে ক্রিকেটের আকাশ থেকে খসে পড়লো আরো একটি তারা। নিঃসন্দেহে বাইশ গজের এই মহানায়ককে ক্রিকেট প্রেমীরা মনে রাখবে যুগ যুগ ধরে। জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের গল্পে একজন মহানায়ক হয়ে থাকবেন ব্রেন্ডন রস মারে টেলর।
নিউজক্রিকেট টুয়েন্টিফোর/ মারুফ ইসলাম ইফতি
