নিউজ ক্রিকেট ২৪ ডেস্ক »
বাংলাদেশ ক্রিকেটের উত্থান নিয়ে যাঁদের একটু জানা-শোনা আছে, তাঁদের নিশ্চয় ‘মোহাম্মদ রফিক’ নামটার সাথে পরিচয় আছে। এই যুগের তরুণদের হয়তো ভাগ্য হয়নি রফিকের খেলা সরাসরি দেখার, তবে ইউটিউবের কল্যাণে অনেকেই দেখেছেন হয়তো তার খেলা। তিনি বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল লেভেলের খেলা, যা তার আগে কেউ পারেনি ।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের উত্থানপর্বে ‘মূলতান ট্রাজেডি’ নামের একটা অধ্যায় আছে। ২০০৩ সালের ঘটনা। ৩ ম্যাচ সিরিজের শেষটিতে পাকিস্তানের চুরি-প্রতারণার কাছে হেরে যায় বাংলাদেশ। সে ম্যাচে শেষ উইকেট জুটিতে ইনজামাম উল হকের সাথে ছিল উমর গুল। ‘ম্যান কান্ডিং’ নামের যে শব্দটা ক্রিকেটে প্রচলিত আছে, বাস্তবিকভাবে তার সাথে আমাদের পরিচয় করে দিয়েছিলেন মোহাম্মদ রফিক। উমর গুলকে নিশ্চিত রান আউট না করে ক্রিকেটে মহানুভবতার এক অম্লান মূর্তি স্থাপন করেছিলেন তিনি। বাংলাদেশ ম্যাচটি শোচনীয়ভাবে হেরে যায়। পরবর্তীতে রফিককে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি তাঁর সরল ভাষায় উত্তর দিয়েছিলেন, “আউটটা করলে আমরা জিতে যেতাম ঠিক; কিন্তু, মানুষ আমাদের ছোটলোক ভাবত। আমরা ছোট লোক নয়।”
রফিক যে ছোট লোক না তার প্রমাণ সে আরো একবার রেখেছিলেন ১৯৯৭ সালে।১৯৯৭ সালে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ের পর অংশ নেওয়া সকল খেলোয়াড়কে সরকারি অনুদানে জমি আর গাড়ি দেওয়া হয়েছিল। মোহাম্মাদ রফিক সে টুর্নামেন্টের ১৯ উইকেট নিয়েছিলেন আর ফাইনালে করেছিলেন ম্যাচজয়ী ২৫ রান। তাঁর সে জমি দান করেছিলেন এলাকার বস্তিতে স্কুলের জন্য; আর গাড়ি বিক্রির টাকায় উঠেছিল স্কুলের বিল্ডিং। বলেছিলেন, “আমরা তো লেখাপড়া করতে পারি নাই। পোলাপাইনগুলা যেন পারে।” পরবর্তীতে তাঁর দান করা এক জমিতে হয়েছিল চক্ষু হাসপাতাল।
রফিক ক্রিকেট মাঠে ছিলেন একজন দুর্দান্ত ক্রিকেটার। ব্যাটিং ও বোলিংয়ে তিনি পারদর্শী ছিলেন সমান ভাবে। স্পিনার হিসেবে দলে থাকলেও ব্যাট হাতেও ছিলেন দুর্দান্ত । ব্যাট হাতে তার ক্যামিও গুলো দেখলে আপনি ভাবতেই পারবেন না উনি মূলত একজন বোলার , টেস্ট ক্রিকেটে যার সংগ্রহ ১০০ উইকেট, আর ওয়ানডেতে ১২৫ উইকেট।
কি বোলিং, কি ব্যাটিং, কি ফিল্ডিং, কি ব্যক্তিত্ব— ক্রিকেট মাঠ ও মাঠের বাইরের প্রতিটি বিভাগেই নিজেকে উজাড় করে তিনি প্রমাণ করে দিয়ে গেছেন উনি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। দেশপ্রেমের স্মারক রেখে গেছে প্রতিটি বিভাগেই। সৌরভ গাঙ্গুলীর মাধ্যমে ভারতে খেলার প্রস্তাব এসেছিল; দেশের স্বার্থে হাসিমুখে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সে প্রস্তাব। আর স্পোর্টসম্যানশীপের কথা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না— যা ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটে মডেল বলা যায়। উইকেট পাওয়ার পর ‘পাড়ার ক্রিকেটে শিশু-কিশোররা যে শিশুসুলভ সেলিব্রেশন করে’, ঠিক সেটাই দেখা যেত মোহাম্মদ রফিক উইকেট পাওয়ার পর।
বাংলাদেশে ইন্টারন্যাশনাল লেভেলের ক্রিকেটার তৈরি হওয়ার শুরু তাঁর থেকে। তাঁকে দেখে বাহাতি স্পিনাররা স্বপ্ন দেখত; স্বপ্ন দেখতে দেখতে ওঠে এসেছিল এনামুল জুনিয়র-রাজ্জাক-সাকিবের মতো স্পিনার। দুর্ভাগ্য এ যে, উনার বাঁহাতি স্পিনকে আইডল মেনে অনেকে দলে এসেছে; তবে উনার ডেডিকেশন, ব্যক্তিত্ব আর গ্রেট-স্পোর্টসম্যানশীপকে ধারণ করতে পেরেছে খুব কম ক্রিকেটার।
১৯৯৫ থেকে ২০০৮— দীর্ঘ এক যুগের বেশির ক্যারিয়ারে তিনি স্পোর্টসম্যানশীপের এক মহানজির সৃষ্টি করেছেন; সারাজীবনে ধারণ করেছেন অসাধারণ ব্যক্তিত্বের এক মোহাম্মদ রফিককে। বাংলাদেশে ‘জ্ঞানীদের কদর না করার একটা সিস্টেম আছে’। সে সিস্টেমে বলি হয়েছেন তিনিও। টক শোতে নিজের সরল ভঙ্গিতে-ভাষায় কথা বলে যাওয়া মানুষটা বিপিএলের মত লিগে ডাক পেলেই হাসিমুখে ছুটে এসে সাধ্যমত দিয়ে যান দেশের ক্রিকেটের জন্য; এরপর চলে যান বুড়িগঙ্গার ঐ পাড়ের নিজের রডের ব্যবসা দেখতে। এত বড় ক্রিকেট বোর্ড, ক্রিকেট দল, বয়স ভিত্তিক দল, এইচপি দল— কোথাও তাঁর ঠাই হয়নি, তাঁকে ডাকা হয় না; অথচ এ সেক্টরগুলোতে উনার মত উজাড় করে একজন মানুষের, একজন কোচের, একটা ব্যক্তিত্বের বড্ড প্রয়োজন। উনি ছুটে গিয়েছেন সে নিজের এলাকায়, যেখান থেকে উদাহরণ হয়ে ওঠে আসে লাখে একটা মোহাম্মদ রফিক।
১৯৭০ সালের আজকের এই দিনে মায়ের কোল আলোকিত করে পৃথিবীর বুকে এসেছিলেন মোহাম্মদ রফিক। আজ এই মহান ক্রিকেটারের ৫১ তম জন্মদিন ।নিউজ ক্রিকেট২৪ এর পক্ষ থেকে মোহাম্মদ রফিকের জন্য রইলো অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও শুভকামনা। রফিকরা ভালো থাকুক সবসময়, লড়ে যাক দেশের ভালোর জন্য।
নিউজ ক্রিকেট/ সুফিয়ান।
