নিউজ ক্রিকেট ২৪ ডেস্ক »
মিরপুর টেস্টে অষ্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২০ রানে জিতেছিল বাংলাদেশ। টেস্ট ইতিহাসে প্রথম বারের মতো অষ্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়ের গৌরব অর্জন করে বাংলাদেশ। সাদা পোশাকের ক্রিকেট আনাড়ি দল বাংলাদেশ। রঙিন পোশাকে সাফল্যে আসলেও টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ছিল মলিন। এখন পর্যন্ত টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সাফল্য হাতে গোনা কয়েক ম্যাচ। টেস্ট খেলুড়ে বড় দল ওয়েস্ট ইন্ডিজ, শ্রীলংকা এবং ইংল্যান্ডকে হারানোর অভিজ্ঞতা ছিল বাংলাদেশের। সেই দলটিই কিনা অষ্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিল ৪ দিনের ব্যাবধানে। এর আগে অষ্ট্রলিয়ার বিপক্ষে ৪ বার মুখোমুখি হয়েও জয়ের দেখা পায় নি বাংলাদেশ।
চতুর্থ ইনিংসে বাংলাদেশের দেওয়া ২৬৫ রানের টার্গেটে খেলতে নেমে ২৪৪ রানে অলআউট হয় অষ্ট্রেলিয়া। লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ২৮ রানে ২ উইকেট হারায় অষ্ট্রিয়ার। সেই সময়ে বাংলাদেশের সামনে দেয়াল হয়ে দাড়ান ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নার এবং চার নম্বরে ব্যাটিংয়ে নামা স্টিভেন স্মিথ।তৃতীয় উইকেটে ১৯৫ বলে ১৩০ রানের জুটি গড়েন দু’জন। এক প্রান্তে স্মিথ শান্ত হলেও অপর প্রান্তে আক্রমনাত্মক ব্যাটিং করতে থাকেন ওয়ার্নার। ১৩৫ বলে ১৬ চার ও ১ ছক্কায় ১১২ রান করা ওয়ার্নারকে ফিরিয়ে বাংলাদেশকে স্বস্তি এনে দেন সাকিব। দলীয় ১৫৮ রানে তৃতীয় উইকেট হারায় অষ্ট্রিেলিয়া। এরপর সাকিব, তাইজুলের ঘূর্নিতে দিক হারায় তারা। ১৯৯ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে চতুর্থ দিনের লাঞ্চ বিরতিতে যায় অষ্ট্রেলিয়া।
সেই সময়ে ক্রিজে ছিলেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল এবং প্যাট কামিন্স। লাঞ্চ বিরতির পর ইনিংসের প্রথম বলেই অষ্ট্রেলিয়ার শেষ ভরসা গ্লেন ম্যাক্সওয়েলকে ১৪(২৫) ফিরিয়ে দেন সাকিব আল হাসান। ধারাভাষ্য কক্ষ থেকে ভেসে আসে সাকিব ইউ বিউটি! বাংলাদেশ তখন জয়ের আনন্দ করতে শুরু করে। কিন্তু কে জানতো এর পরেও নাটকীয়তা বাকি রয়েছে। নাথম লায়ান এবং প্যাট কামিন্স অসাধারণ ব্যাটিং করতে থাকেন। ২৪ বলে ১২ রান করে দলীয় ২২৮ রানে আউট হন নাথান লায়ন। লায়নকে ফেরান মেহেদী হাসান মিরাজ।
শেষ উইকেট অষ্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন ৩৭ রান। মেহেদী মিরাজকে এক ওভারে ২ ছক্কা হাঁকিয়ে বাংলাদেশ শিবিরে কাঁপন ধরালেন প্যাট কামিন্স। পুরো গ্যালারি তখন নিস্তব্দ। বাংলাদেশ দলের সবার কপালে চিন্তার ভাজ, কি হতে যাচ্ছে। উইকেটে পিছনে ছলছল চোখে তাকিয়ে মুশফিকুর রহিম। শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশের হাত থেকে ম্যাচ বের করে নেওয়ার ঘটনা নেহাত কম নয়। সেই চিন্তাটাই যেন চেপে বসল আমার উপট। আসলেই সেরমক কিছু হবে নাতো? পুরো শরীর তখন শিরশির করছে, রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে আসছে। কিছুখন আগেও ম্যাচটা যে আমাদের পক্ষেই ছিল।
মিরাজের পরের ওভারে বোলিংয়ে এসে মিডেন দেন সাকিব। পরের ওভারে মিরাজকে আনার সাহস দেখালেন না মুশফিকুর রহিম। তাই সাকিবের পরের ওভারে তাইজুলের হাতে বল তুলে দেন তিনি। স্টাইকে জস হ্যাজলউড টানা ৪ টি বল ডট দিলেন জস হ্যাজলউড , ৫ম বলটি করতে প্রস্তত তাইজুল ইসলাম। ফিল্ডিংয়ে কিছু ফাইনটিউন করে নিলেন। এরাউন্ড দ্য উইকেটে এসে বল করলেন তাইজুল, এলোমেলো ভাবে ব্যাট চালালেম জস হ্যাজলউড। তার ব্যাট ফাঁকি দিয়ে বল লাগলো তার প্যাডে। আউজ দ্যাট বলে চেঁচানি শুরু করলেন মুশফিক এবং তাইজুল। সমস্বরে চিত্কার করে উঠলেন সাকিব, সৌম্যরা। আঙুল তুলে দিলেন নাইজেল লং। জস হ্যাজলউড তখন একটা রিভিউয়ের খোঁজে। আম্পায়ার বলে দিলেন নো হ্যাভ রিভিউ! উল্লাসে ফেটে পরলো পুরো গ্যালারি, মিরপুর হয়ে পুরো বাংলাদেশে। লেখা হলো নতুন ইতিহাস!
এর আগে ২৭ আগষ্ট শরতের রৌদ্রজ্বল সকালে টস জিতে ব্যাটিং নেন বাংলাদেশ কাপ্তান মুশফিকুর রহিম। মিরপুরের আকাশে তখন ঝলমলে রোদ আর সাদা মেঘের মিতালি। এর মাঝে ব্যাট হাতে নেমে পরলেন তামিম ইকবাল এবং সৌম্য সরকার। দুজনের মুখেই হাসি লেগে আছে। কিছুখন পরেই যেন থমকে গেল সবকিছু। বাংলাদেশ ইনিংসে নেমে এলো বিপর্যয়। প্যাট কামিন্সের ছোবলে মাত্র ১০ রানেই নেই ৩ উইকেট। সৌম্য সরকার ৮(৮), ইমরুল কায়েস ০(৬) এবং সাব্বির রহমান ০(১)। মিরপুরের আকাশে যেন মেঘের ঘনঘটা। টগবগে সূর্যটাও যেন আড়ালে মুখ লুকিয়ে আছে।
সেখান থেকে বাংলাদেশকে টেনে তুললেন তামিম ইকবাল এবং সাকিব আল হাসান। দুই প্রান্ত থেকে অষ্ট্রেলিয়া বোলারদের রুখে দেন সাকিব -তামিম। প্যাট কামিন্স, জস হ্যাজলউড, লায়ন, আগারদের হতাশায় ডুবিয়ে ২৫০ বলে ১৫৫ রানের জুটি গড়েন তামিম-সাকিব। ১৪৪ বলে ৫ চার ও ৩ ছক্কায় ৭১ রানের ইনিংস খেলেছেন তামিম ইকবাল। আরও কিছুখন থাকার পর ফেরেন সাকিব। ১৩৩ বলে ১১ চারে ৮৪ রান করেন তিনি। মুশফিক ১৮(৫০), নাসির হোসেন ২৩(৮১), মিরাজ ১৮(৩৮) রানের ইনিংসে ২৬০ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের দেওয়া ২৬০ রানের লিডের বিপরীতে খেলতে নেমে বাংলাদেশের তিন স্পিন ত্রয়ীর জবাব খুঁজে পায় নি অষ্ট্রেলিয়া। দলীয় ৩৩ রানেই ৪ উইকেট হারিয়ে বসে তারা। কিছুটা লড়াই করে ম্যাট রেনেশো ৪৫(৯৪), পিটার হ্যান্ডসকব ৩৩(৬৯), ম্যাক্সওয়েল ২৩, আগার ৪১, এবং প্যাট কামিন্স ২৫। সাকিব, মিরাজ, তাইজুলে ২১৭ রানে অলআউট হয় অষ্ট্রেলিয়া। ৪৩ রানের লিড পায় বাংলাদেশ।
৪৩ রানে এগিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করে বাংলাদেশ।দ্বিতীয় ইনিংসে দলীয় ৪৩ রানে সৌম্য ১৫(৫৩) বিদায়ে ভাঙে ওপেনিং জুটি। এরপর দ্রুতই কিছু উইকেট পরলে এক প্রান্ত আগলে রাখেন তামিম ইকবাল। ১৫৫ বল খেলে ৮ চারের সাহায্যে করেন ৭৮ রান। এরের ১১৪ বলে ৪১ রানের ইনিংস খেলেন মুশফিকুর রহিম। সাকিব ৫(১২), সাব্বির ২২(৩৬), মিরাজের ২৬(৩৫) রানের ইনিংসে ২২১ রান করে অলআউট হয় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ লিড পেয়েছিল ২৬৪ রান।
অষ্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তিন ফর্মেটেই জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। ২০০৫ সালে কার্ডিফ ওয়ানডে ক্রিকেটে ইতিহাসের প্রথম জয়, ২০১৭ সালে মিরপুরে টেস্ট জয়ের পর ২০২১ সালে টি টোয়েন্টি ক্রিকেটেও অষ্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। টি টোয়েন্টি ক্রিকেট সিরিজ জয়েরও কৃতিত্ব রয়েছে বাংলাদেশের। এই ধারা অব্যাহত থাকুক, বাংলাদেশ ক্রিকেট পৌছে যাক সাফল্যের শীর্ষে!
