ভারতীয় ক্রিকেটের এক রাজার গল্প

নিউজ ক্রিকেট ২৪ ডেস্ক »

২০০৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সফরে চট্টগ্রামে তাঁর অভিষেক হয়েছিল। সে ম্যাচে ব্যাটিংয়ে নেমে কোনো রান করার আগেই প্যাভিলিয়নে ফিরেছিলেন তিনি। হতাশ, ভগ্ন হৃদয়ে। মোহাম্মদ রফিকের বলে শর্ট স্কয়ার লেগে ঠেলে দিয়েই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের প্রথম রানটা তুলে নিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাপস বৈশ্যর থ্রোয়ে বাংলাদেশের উইকেটরক্ষক খালেদ মাসুদ যখন তাঁর স্টাম্প ভেঙে দিলেন, তরুণ ছেলেটির হয়ত তখন সামনে অন্ধকার দেখছিলেন। সেদিন এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকেরা ভাবতেও পারেননি, যে খেলোয়াড়টির ফিরে যাওয়া তারা উদ্‌যাপন করছেন, তিনিই ক্যারিয়ার শেষ করবেন ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সফল ও সেরা হিসেবে। কি চিনতে পারছেন তো?? হ্যা আমি ঠাণ্ডা মস্তিষ্কের, ক্রিকেট মাঠের ট্রাফিক পুলিশ উপাধি পাওয়া মহেন্দ্র সিং ধোনির কথাই বলছি।

অবাক করা বিষয় কি জানেন?? এই ধোনি যখন পুরো ক্রিকেট বিশ্বকে অন্ধকার দেখিয়ে ক্রিকেটকে বিদায় বললেন, তখন মনে ভেসে উঠলো ২০১৯ বিশ্বকাপের কথা। বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে যে ধোনি খেলেছিলেন তার শেষ ম্যাচটি।ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ডে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দলের বিপর্যয়ের মুখে ৫০ রানের এক ইনিংস খেললেন ধোনি। সেই ইনিংসে ভারতকে প্রায় ফাইনালে তুলেই দিয়েছিল। কিন্তু রান আউটে সেই আশার সমাধি। সমাধি হয়েছে ধোনির ১৫ বছরের ক্যারিয়ারেরও ।

দুই রান আউটের মাঝখানের সময়টা অবশ্য অবিশ্বাস্য। চট্টগ্রামের সেই ম্যাচে রান আউট হয়ে ফেরার সময়ই হয়তো ধোনি মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলেন নিজের লক্ষ্যটা। নাহ্, সেটি কেবল আর দশজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের মতো সাধারণ একটা জীবনের নয়, তিনি লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার। আর সেটি তিনি করে দেখিয়েছেন।নিজেকে প্রমাণ করা থেকে শুরু করে ভারতের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হওয়া। ভারতীয় ক্রিকেটে নিজের ব্যক্তিত্বকে ব্যবহার করে মহাগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে ওঠা। ক্রিকেটের সর্বকালের অন্যতম সেরা নেতার কাতারে নিজেকে অধিষ্ঠিত।

নিজের অভিষেক ম্যাচে ‘শূন্য’। পরের তিনটি ইনিংসে ১২, অপরাজিত ৭ ও ৩। এর পরপরই ক্রিকেট দুনিয়া চিনল ধোনিকে। বিশাখাপত্তমে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১২৩ বলে ১৪৮ রানের এক ইনিংস দিয়েই তিনি হয়ে গেলেন ভারতের ঘরোয়া এক নাম। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে কাঁপিয়ে দেওয়া সেই সেঞ্চুরিই তাঁকে পথ করে দিল নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার। তিন নম্বরে নেমে করা সেই সেঞ্চুরিটি তাঁকে ভারতের মিডল অর্ডারের নির্ভরশীলতায় পরিণত করল। অচিরেই এক ম্যাচ উইনারে পরিণত হলেন। তাঁর নামের পাশে বসে গেল ‘গ্রেট ফিনিশার’ উপাধি।

এরপর কতো উপাধি এসেছে তার নামে তার কোন ইয়াত্তা নেই। ক্যাপ্টেন কুল, ট্রাফিক পুলিশ আরো কিযে এসেছে তা বলে শেষ করার মতো নয় ।

অধিনায়ক হিসেবে তাঁর শুরুটাও রূপকথার মতোই। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত খেলতে গেল দলের ত্রিরত্ন শচীন টেন্ডুলকার, সৌরভ গাঙ্গুলী ও রাহুল দ্রাবিড়কে ছাড়াই। তরুণ ধোনির হাতে তুলে দেওয়া হলো ভাঙ্গাচুরা দলটার লাগাম। কিন্তু মোটামুটি তারুণ্য নির্ভর একটা দল নিয়ে ধোনি নিজের নেতৃত্বের পরীক্ষায় পেলেন ১০০ তে ১০০-ই। তাঁর হাতে দিয়েই ১৯৮৩ সালের পর ভারত পেল ক্রিকেটে প্রথম বিশ্বজয়ের গৌরব।প্রথম টি২০ বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব। এরপর ধোনিকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে, একের পর এক ধরা দিয়েছে সাফল্য, ওয়ানডে বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, এশিয়া কাপ সবধরনের ট্রফি জিতেছেন অধিনায়ক হিসেবে। ভাঙ্গাচুরা দলকে করেছেন ক্রিকেট পরাশক্তি।

ব্যাটসম্যান ধোনি

৯০ টেস্টে ৩৮.০৯ গড়ে ধোনি করেছেন ৪৮৭৬ রান। এরমধ্যে রয়েছে ৬টি সেঞ্চুরি। এদিকে ৩৫০ ওয়ানডেতে এ ডানহাতি করেন ৫০.৫৭ গড়ে ১০৭৭৩ রান। তার এ সংস্করণে সেঞ্চুরি রয়েছে ১০টি। আর ৯৮টি টি-টোয়েন্টিতে ধোনি করেছেন ৩৭.৬০ গড়ে ১৬১৭ রান।

উইকেটরক্ষক ধোনি

৯০ টেস্টে উইকেটের পেছনে ধোনি ক্যাচ নিয়েছেন ২৫৬টি। আর স্ট্যাম্পিং করেছেন ৩৮টি। এদিকে ৩৫০ ওয়ানডেতে এ তারকা ক্যাচ নিয়েছেন ৩২১টি। আর স্ট্যাম্পিং করেছেন ১২৩বার। এছাড়া ৯৮ টি-টোয়েন্টিতে ৫৭ ক্যাচ ও ৩৪ বার স্ট্যাম্পিং করেছেন।

বোলার ধোনি

ক্যারিয়ারে বেশ কয়েকবার অনেকটা শখের বশে বল হাতে নিতে দেখা গেছে ধোনিকে। সব মিলিয়ে টেস্টে ৯৬ বল করে ৬৭ রান দিয়েছেন তিনি। এদিকে ওয়ানডেতে ৩৬ বল করে ৩১ রান দিয়ে এ ডানহাতি পেসার নিয়েছেন ১টি উইকেট। টেস্ট ও ওয়ানডেতে বল হাতে নিলেও ধোনি অবশ্য টি-টোয়েন্টিতে নেননি।

অধিনায়ক ধোনি

টেস্টে ভারতকে ৬০ ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছেন ধোনি। এরমধ্যে ২৭টিতে জিতেছেন তিনি। আর ১৮টিতে হার ও ১৫টিতে ড্রয়ের কৃতিত্ব দেখিয়েছেন এ তারকা। এদিকে ১৯৯ ওয়ানডেতে ভারতকে নেতৃত্ব দিয়ে ধোনি ১১০ ম্যাচে জয় এনে দিয়েছেন। এছাড়া ৭৪ ম্যাচে হার দেখেছেন তিনি। আর ৭২টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে নেতৃত্ব দয়ে ৪১টিতে ভারতকে জয়ী করেছেন ধোনি। ২৮ বার অবশ্য এ ফরম্যাটে হার দেখেছেন মাহি।

ধোনি ক্রিকেটকে বিদায় বলেছেন, তবে ক্রিকেট বিশ্ব কি পারবে এই নেতাকে ভুলতে?? ধোনি ক্রিকেটকে দিয়েছেন নিজের পুরো সামর্থ্য পুরোটাই, ক্রিকেট বিধাতাও ধোনিকে দিয়েছে দুইহাত ভরে। স্টেশন মাস্টার ধোনিকে আজ তরুণরা মানে ক্রিকেট মাস্টার হিসেবে। ধোনি আজ ক্রিকেট বিশ্বের এক আদর্শের নাম, আজ থেকে শত বছর পরেও হয়ত ধোনিকে মনে রাখবে ক্রিকেট বিশ্ব, ক্রিকেট ইতিহাস। বারবার কোন তরুণ ক্রিকেটার নিজের আইডল হিসেবে যখন ধোনির নামটা মনে করিয়ে দিবে তখনই আবার সবার সামনে ভেসে উঠবে এই তারার গল্প গুলো। ধোনি এভাবেই বেঁচে থাকবেন ক্রিকেটে, ক্রিকেট প্রেমীদের মনে।

নিউজক্রিকেট/সুফিয়ান

নিউজটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »