জাকির মামুন »
নূর নাহিয়ান হুইলচেয়ার ক্রিকেট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের কো-ফাউন্ডার ও প্রশাসনিক পরিচালক। বাংলাদেশ হুইল চেয়ার ক্রিকেট দলের সহ অধিনায়ক৷ এছাড়াও ‘বাংলাদেশ হুইলচেয়ার স্পোর্টস ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় হলেও জন্ম বেড়ে উঠা রাজধানী শহর ঢাকাতেই৷ হাজারও প্রতিবন্ধকতাকে দূরে ঠেলে দেশের পতাকা উড়িয়েছেন বিশ্ব দরবারে৷ ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটই ছিলো ধ্যান-জ্ঞান৷ মাঝপথে একটি ঝড় সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিলেও একটু পিছপা হননি এই যুবক৷ বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলে খেলা স্বপ্নবাজ ছেলেটি আজ বাংলাদেশের দলেই খেলছেন৷ হয়তো বিভাগ টা ভিন্ন৷ প্রতিনিধিত্ব করে যাচ্ছেন বাংলাদেশের হয়ে ৷
জীবন সংগ্রামে উত্তীর্ণ এই যুবক তার জীবনের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে কথা বলেছেন আমাদের প্রতিবেদক জাকির মামুনের সাথে৷
নিউজক্রিকেট২৪: ভারতে সিরিজ ছিলো৷ করোনা ভাইরাসের তা কারণে স্থগিত৷ কিভাবে সময় কাটাচ্ছেন?
নুর নাহিয়ানঃ বর্তমানে আমি আমার ‘বাংলাদেশ হুইলচেয়ার স্পোর্টস ফাউন্ডেশন’-সংগঠনের কাজগুলো নিয়েই ব্যস্ত আছি৷ পরিকল্পনাগুলো নিয়ে কাজ করছি যেনো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই পুরোদমে কাজ করতে পারি৷ পাশাপাশি ঘরের মধ্যে ক্রিকেট প্র্যাকটিস করে যাচ্ছি, সামনের সিরিজের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি এবং গ্রাফিক্সের কাজ করছি, কাজটি করতে ভালো লাগে৷
নিউজক্রিকেট২৪: আপনি কি জন্মগত শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধকতার শিকার ছিলেন?
নুর নাহিয়ানঃ না৷ অন্যান্য তরুণ যুবকের মত আমিও দাঁপিয়ে বেড়াতাম৷ কিন্তু আমার ভাগ্যাকাশে এমনটা ছিলো, তাই হয়তো আমি এখন কিছুটা শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধকতার শিকার৷ ২০০৮ সালেই নেমে আসে আমার অমানিশা অন্ধকার৷
নিউজক্রিকেট২৪: কিভাবে আপনি আজ এই সমস্যার সম্মুখীন হলেন?
নুর নাহিয়ানঃ ২০০৮ সালের ২৫ মার্চে আমি আমাদের বিদ্যালয় সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুলের ক্লাসরুমে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম আমার বাম পায়ের গোড়ালি মোচকে যাচ্ছে। আমি পায়ে শক্তি পাচ্ছি না। ঠিকমত দাঁড়াতে পারছিনা৷ খুব ব্যথা শুরু হয়ে গেলো৷ আমার আত্মচিৎকারে ক্লাসরুমের সবার চোখেমুখে চিন্তার ভাজ পড়তে লাগলো৷ সেখান থেকে স্কুল কর্তৃপক্ষ নিয়ে যাওয়া হলো ন্যাশনাল মেডিকেলে। তারপর সেখানে বাসার সবাই আসলেন। আমাকে নিয়ে যাওয়া হল আরেকটি হাসপাতালে। সেখান থেকে প্রাথমিক মেডিসিন দিয়ে বলা হলো দুর্বলতার কারণে এমনটা হয়েছে। বাসায় পাঠিয়ে দেয়া হল আমাকে। পরদিন সকালবেলা আমার শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে। বুক থেকে পা পর্যন্ত অবশ হয়ে যায়। বাসা থেকে সকালবেলায় ভর্তি ইবনে সিনা হাসপাতালে। সেখানে নানান ধরণের টেস্টের পর এবং বাংলাদেশের নিউরো ও অর্থপেডিকস বিভাগের নামকরা ডাক্তাররা আসেন আমাকে দেখতে, কিন্তু কেউ কোন সিদ্ধান্ত ঠিকমত দিতে পারেননি। সেখানে প্রায় ৪/৫ দিন ভর্তি ছিলাম। অবশেষে ডা. মহিবুর রহমান আমার রিপোর্ট দেখে সন্দেহ করেন যে, আমার স্পাইনাল কর্ডে রক্ত জমাট হয়েছি। সাথে সাথে তিনি পরামর্শ দেন আমাকে দিল্লিতে নিয়ে যাবার জন্য। কিন্তু, প্রচণ্ড ব্যথার কারণে আমাকে পেনকিলার দিয়ে বেশিরভাগ সময় অচেতন রাখা হতো। আমার শরীরের কোন মুভমেন্ট না থাকায় এবং অচেতন অবস্থার কারণে এয়ারপোর্টে গিয়েও ফিরে আসতে হয়। পরবর্তীতে স্ট্রেচারে শুয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে বাবা-মা আমি ঢাকা থেকে বেনাপোল, বেনাপোল থেকে কলকাতায় দুই রাত অবস্থান করে অবশেষে ট্রেনের মাধ্যমে দিল্লীতে পৌঁছায়৷ ওখানে একজন পরিচিত আঙ্কেল ছিলেন। তিনি আমাকে ট্রেন স্টেশন থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে দিল্লির হসপিটালে নিয়ে যান। আমার অপারেশন হয়৷ কিন্তু, অপারেশনের পরও আমার শরীরে কোন ধরণের মুভমেন্ট ছিল না। তবে, ব্যথা একদম চলে গিয়েছিল। এরপর ঐ হাসপাতালে কিছুদিন অবজারভেশনে থাকার পর যেদিন চলে আসব সেদিন আরেকটা সমস্যা দেখা দেয়। আরো এক সপ্তাহ সেই সমস্যার চিকিৎসা চলে। প্রায় ১৫-১৬ দিন পর ডাক্তারদের পরামর্শক্রমে আমি ঢাকায় ফিরে আসি। ঢাকা আসার পর মিরপুর সিআরপিতে ভর্তি থেকে আমি থেরাপি নিতে শুরু করলাম৷ বছর খানেক থেরাপি নিলাম৷ দীর্ঘ ৯ মাস বেডেই ছিলাম৷ শরীরের তেমন মুভমেন্ট ছিলোনা৷ নড়চড়া করতে পারতামনা৷
তারপর হঠাৎ একদিন সিআরপিতে আমি শুয়ে থাকা অবস্থায় আম্মু একটু মুভমেন্ট লক্ষ্য করল পায়ের। তারপর ধীরে ধীরে হুইলচেয়ারে বসা প্র্যাকটিস করানো হলো আমাকে। তারপর ওয়াকের ভর দিয়ে হাঁটার প্র্যাকটিস করানো হয়।
এভাবে বছর দু’য়েক যাওয়ার পর ব্লাডারজনিত কিছু জটিলতার কারণে ২০১০ সালে আমি, আম্মু, আকবর ভাই ও আমার বড় খালু ভারতের ভেলোরের সিএমসি হাসপাতালে যাই৷ তারা বেশ কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষার পর আমার চিকিৎসা শুরু করেন এবং কিছুদিন অবজারভেশনের পর আমাকে বলেন যে, আমার কিডনি ৬০% ডেমেজ। মাথায় আবার আকাশ ভেঙ্গে পড়ল আমাদের সবার ওপর। আমার কিছুদিন সময় চাই। তারপর ঢাকা ফিরে আসি এবং চেকাপের জন্য আবার যাই ভেলোরে। ডাক্তাররা টেস্ট করে জানান, আপাতত কিডনি স্বাভাবিক আছে। এর পাশে ফিজিওথেরাপির ট্রিটমেন্ট নেই সেখানে।
এভাবে চলতে চলতে ২০১১ ফেব্রুয়ারীতে একদিন নিয়মিত ব্যায়াম করার সময়ে হঠাৎ অনুভুত হলো যে আমার বাম পা টা বেঁকে যাচ্ছে৷ দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিনা৷ এমতবস্থায় আবারও মনের আকাশে মেঘ জমে গেলো৷ পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত নিলাম যে, ভেলোরে যাবো এবং মার্চে আমি, আম্মু আর আমার চাচা ভেলোরের সিএমসিতে গেলাম৷ ওখানে ডাক্তাররা পরীক্ষা করে দেখেন যে, হিপ জয়েন্টটা আর বাম পায়ের সংযোগস্থল ডিসপ্লেস হয়ে গেছে। বাম পা সরে গিয়ে উপরে উঠে গেছে৷ তারা বিভিন্ন ধরণের অপারেশনের কথা বললেন। আমরা সেখানে বসেই সিদ্ধান্ত নিলাম যিনি আমার অপারেশন করেছিলেন ডা. সাকির হুসাইন তাঁর সাথে দেখা করতে যাবো দিল্লিতে।
২০১১ তে আবার দিল্লীতে যাই৷ তাঁর সাথে দেখা করি। তিনি তিনটি ডিপার্টমেন্টে রেফার করেন এবং সম্মিলিতভাবে ডাক্তাররা সেখানে বেশ কিছু টেস্ট করেন। একটি টেস্টে ডিসপ্লেস জায়গাতে কালো শেড থাকায় তারা সন্দেহ করেন ক্যান্সার জাতীয় কিছু হয়েছে কিনা। তারা আরো কিছু জটিল টেস্ট করেন এবং সব ফলাফল ভালো আশার পর ডা. সাকির হুসাইন আমাকে পরামর্শ দেন যে, এই সমস্যার জন্য অপারেশন বা রিপ্লেসমেন্ট পদ্ধতি রয়েছে। কিন্তু, আমার যে সমস্যার কারণে আমি শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার এ কারণেই, অপারেশন বা রিপ্লেস করলেও নানান ধরণের জটিলতা দেখা দিতে পারে। তিনি আমাকে পরামর্শ দেন, হুইলচেয়ার করে চলাফেরা করার জন্য এবং ডিসপ্লেস জায়গা যেন কোনভাবে আঘাতপ্রাপ্ত বা বাম পায়ের ওপর কোন ধরণের প্রেসার না পরে৷ ঢাকা ফিরে এসে কিছুদিন থেরাপি করার পর থেরাপি বন্ধ করে দিলাম যেন বাম পায়ের ওপর প্রেসার না পরে। ঘরে থেকেই টুকটাক নিজের মতো করে থেরাপি নিতাম। পাশাপাশি ডা. সাকির হুসাইনের পরামর্শগুলো মেনে চলতে শুরু করলাম৷ এরপর থেকে পুরোদমে আমি হুইলচেয়ার ইউজার হয়ে যাই।

নিউজক্রিকেট২৪: বাবা কিভাবে এই চিকিৎসার ভার বহন করলেন?
নূর নাহিয়ানঃ আমার বাবা ড. আমিনুর রহমান সুলতান এবং মা সাহেলী তাসিমা ফিরদৌস দু’জনই শিক্ষক ছিলেন তখন৷ বলতে গেলে শিক্ষক পরিবারের সন্তান৷ পরবর্তীতে বাবা বাংলা একাডেমীতে যোগদান করেন৷ তাঁদের জমানো অর্থ আর আত্মীয় স্বজনের সাহায্য সহযোগিতায় আমার চিকিৎসায় বেগ পেতে হয়নি৷
নিউজক্রিকেট২৪: কিভাবে সংযুক্ত হলেন হুইলচেয়ার ক্রিকেটের সাথে?
নূর নাহিয়ানঃ আসলে সুস্থ থাকা অবস্থায় আগে যখন গ্রামের বাড়িতে যেতাম তখন ক্রিকেট নিয়ে পড়ে থাকতাম। কিন্তু, শারীরিক প্রতিবন্ধকতার পরে প্রথমবার যখনই দাদা বাড়িতে যাই মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। মনে হতে শুরু করে, হুইলচেয়ারে বসে আছি বিধায় কেন খেলতে পারবো না। ঢাকা ফিরে এসে বাসায় টিভিতে খেলা দেখার সময় নানান ধরণের পরিকল্পনা করতাম। ভাবতাম, হুইলচেয়ার বসে কি খেলা যাবে না ক্রিকেট!
২০১১ সালের জুলাই মাসের দিকে নানা বাড়িতে যাই। সেখানেও আমার মনের একই অবস্থা ছিল আর তার সাথে তো শারীরিক জটিলতার সমাহার সাথী ছিল। নানা বাড়িতে থাকা অবস্থায় একদিন মনের মধ্যে জিদ চাপে আমিও ক্রিকেট খেলব। খালাতো ভাইদের বলি ব্যাট বল কিনতে আনতে। বাড়ির উঠানেই সেই প্রথম ক্রিকেট ব্যাট আর বল হাতে তুলে নেয় ৷ সবাই তো রীতিমত অবাক হয়, অনেকে আশ্চর্য ও হয়৷ ওদের আশ্বস্ত করে আমি বলি, সমস্যা হবেনা৷ হুইলচেয়ারে বসে আমি তাদের সাথে খেলি৷ সেদিন খেলা শেষে মনের জিদটা আরো প্রবল হয়। সংকল্প করি, কেউ যদি বাংলাদেশে হুইলচেয়ার ক্রিকেট নিয়ে কাজ করে আমি করব এবং এটিকে প্রতিষ্ঠা করবই। আর পাশাপাশি প্রতিবন্ধকতার নানান দিক আমাকে অনুপ্রাণিত করত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কিছু করতে। আমি বাসায় থাকা অবস্থায় খেলাধুলার মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনে সুদিন নিয়ে আসব পরিকল্পনা করতাম। তো, সেদিন খেলা শেষে ফেসবুকে খোঁজ নিতে শুরু করলাম এমন কোনো সংগঠন আছে কিনা হুইলচেয়ার ক্রিকেট নিয়ে কাজ করে বাংলাদেশে। পরে শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংগঠন ‘বি-স্ক্যান’ আমাকে মহসিন ভাইয়ের ফেসবুক আইডি দেয়। তখন তার সাথে যোগাযোগ শুরু করি৷ আমি জানতে পারি যে, তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে ক্রিকেট খেলার আয়োজন করেন এবং তিনিও খেলেন। এক্ষেত্রে ভারতের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্রিকেট নিয়ে কাজ করা হারুন রশিদ ভাই উৎসাহিত করে মহসিন ভাইকে৷ তো, এরই মধ্যে মহসিন ভাই ও হারুন ভাইয়ের আলোচনা ক্রমে ভারতে প্রথম তাজমহল ট্রফির আয়োজন হয়৷ ঐ দলে মহসিন ভাই আমাকে স্কোয়াডে রেখেছিলেন। কিন্তু, ওই সময়ে এইচএসসি পরীক্ষা ছিলো তাই যেতে পারিনি৷ সেই টুর্নামেন্টের পর বাংলাদেশে একটি টুর্নামেন্ট আয়োজন হয়। কিন্তু, মহসিন ভাই জানালেন যে, সেখানে নিয়ম করা হয়েছে যে, হুইলচেয়ার ইউজারদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। এরপর মহসিন ভাইয়ের সাথে কথা বললাম, হুইলচেয়ার ইউজারদের নিয়ে টিম করা যায় কিনা৷ এরপর আলোচনা করে হুইলচেয়ার ক্রিকেট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন গঠন করলাম আমরা। আর পরবর্তীতে গঠন করি বাংলাদেশ হুইলচেয়ার ক্রিকেট দল।
নিউজক্রিকেট২৪: পড়াশুনায় কতটুকু এগুলেন?
নূর নাহিয়ানঃ ২০০৮ সালে অসুস্থ হয়ে যাবার পর শারীরিক অবস্থা ভালো না থাকায় রেগুলার ক্লাস করতে না পারার কারণে সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুলের অথরিটি আমাকে প্রমোশন দেননি। আমি তখন নবম শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। তারা কড়াকড়িভাবে বলে দিয়েছিলেন, ক্লাস করতে না পারলে তাদের কিছু করার নেই। এভাবে দুই বছর গ্যাপ হয়ে যাই এসএসসি দিতে। পরবর্তীতে রাজশাহীতে আমার ছোট মামার স্কুল থেকে এসএসসি দেই এবং ওইখানের আরেকটি কলেজ থেকে এইচএসসি দেই। আপনাদের দোয়ায় এখন আমি একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এর উপর বিএসসি করেছি৷ করোনার কারনে এমএসসিতে ভর্তি হতে পারিনি৷
নিউজক্রিকেট২৪: বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো ধরণের সুযোগ সুবিধা পেয়েছেন?
নূর নাহিয়ানঃ তেমনটা না৷ শুধু একবার নামমাত্র কিছু টাকা কম রেখেছিল৷ আমাকে সব টিউশন ফি দিয়েই পড়তে হয়েছে৷
নিউজক্রিকেট২৪: বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আপনার প্রাপ্তি কী কী?
নূর নাহিয়ানঃ প্রাপ্তি অনেকগুলো আছে। তার মধ্যে আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পোর্টস ক্লাবের পরপর দু’বার ক্লাব প্রেসিডেন্ট ছিলাম এবং আমি আমার ডিপার্টমেন্ট থেকে ক্রিকেট খেলার জন্য সম্মাননা স্মারক গ্রহণ করি।
নিউজক্রিকেট২৪: পড়াশুনার পাশাপাশি খেলাধুলা চালানো টা কতটা কঠিন ছিলো?
নূর নাহিয়ানঃ আসলে আমি আমার সময়টুকু ভাগ করে নিতাম৷ সে অনুযায়ী দু’টোই একসাথে চলতো৷ একটু কষ্ট হলেও মনোবল নিয়ে আমি এগিয়ে গেছি৷ আর এ ক্ষেত্রে আব্বু-আম্মুর সাপোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকমণ্ডলী ও আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী বেশ কিছু বন্ধু-বান্ধব, অগ্রজ ও অনুজের ভূমিকা অসীম। কারণ, ক্লাস কিংবা পরীক্ষা বাদ দিতে বেশিরভাগ সময় আমাকে খেলতে যেতে হতো। তাদের সাপোর্ট না পেলে হয়তো খেলাটা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না। তাদের প্রতি আমি সবসময় কৃতজ্ঞ৷
নিউজক্রিকেট২৪: প্রথমে কোথায় অনুশীলন শুরু করেন?
নূর নাহিয়ানঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলের সামনে আমার নেতৃত্বে প্রথম প্র্যাকটিস শুরু হয়৷ আর মাঠের ব্যবস্থা করে দেন ঢাবির কর্মচারি মইন এবং কোচ হিসেবে দেখভাল করতেন মো. মহিন ভাই৷ আর এই সময় অর্থায়ন করেন আমার আব্বু৷ প্রায় পাঁচ মাস আমরা সেখানে প্র্যাকটিস করি৷ মহসিন ভাই মাঝে মাঝে আসতেন৷
নিউজক্রিকেট২৪: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম পদযাত্রা কবে?
নূর নাহিয়ানঃ ২০১৭ সালে ভারতের বিপক্ষে৷ সবচেয়ে মজার বিষয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রথম উইকেট টা আমারই নেওয়া৷ আমরা ২-১ এ সিরিজ জিতি৷
নিউজক্রিকেট২৪: ক্রিকেটে কাকে আইডল মানেন?
নূর নাহিয়ানঃ আগে দেশের মধ্যে ব্যাটিং-এর জন্য আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও বোলিং-এর মধ্যে শেন ওয়ার্নকে ফলো করতাম৷ তারপর ২০০০ সালের দিকে নাইমুর রহমান দুর্জয় ভাইকে ফলো করতাম। আসলে আমি অফ স্পিন করি তো। বর্তমানে তামিম ইকবাল ভাই আমার আইডল৷ ব্যাটিং-এর সময় তাঁকে ফলো করি।
নিউজক্রিকেট২৪: অবসরে কি করতে ভালোবাসেন?
নূর নাহিয়ানঃ লেখালেখি করতে৷ ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রতিবছরই বইমেলায় আমার বই প্রকাশিত হয়েছে৷ আমার প্রথম বই ‘ভাষার কথা একুশের কথা’। এটি সাক্ষাৎকারধর্মী বই এবং আমার প্রথম কবিতার বই ‘উদ্বাস্তু সিরিজ’ প্রকাশ পায় ২০১৪ সালে। এছাড়াও গ্রাফিক্সের কাজ করতে ভালোবাসি৷
নিউজক্রিকেট২৪: নিজের সবচেয়ে বড় অর্জন কোনটি মনে করেন?
নূর নাহিয়ানঃ দেশের প্রতিনিধিত্ব করাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন আমি মনে করি৷ কেনোনা আমার কাছে সবচেয়ে দেশ বড়৷
নিউজক্রিকেট২৪: আপনার সফলতার পেছনে কাদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি?
নূর নাহিয়ানঃ আমার পরিবারের সকল সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকমণ্ডলী, সহপাঠী বন্ধু, অগ্রজ, অনুজ এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের৷ তবে, বিশেষ করে আমার মা বাবা দু’জনের৷ শারীরিক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বাবা-মা কখনও খেলাধুলা করতে না করিনি৷ বরং তিনি উৎসাহিত করতেন৷ তিনি বাংলা একাডেমি ও বিটিভিতে কাজ করেন ৷ মা ও শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত ৷ এত ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও আমাকে অনেক সময় দেন৷ আমার ভালো মন্দের সবকিছুই তারা দেখেন৷
নিউজক্রিকেট২৪: আপনার ব্যক্তিগত লক্ষ্য কি?
নূর নাহিয়ানঃ আমি চাই প্রতিবন্ধী মানুষেরা সাধারণ মানুষের মত সুযোগ-সুবিধা পাক৷ তাদের আমি খেলাধুলার মাধ্যমে এক কাতারে নিয়ে আসতে চাই। সেজন্য আমি ‘বাংলাদেশ হুইলচেয়ার স্পোর্টস ফাউন্ডেশন’ গঠন করেছি৷ এর মাধ্যমে তাদেরকে স্বনির্ভর করে তুলতে চাই, তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে তুলে ধরতে চাই৷ আর বিশেষ করে আইটি সেক্টরেও তাদেরকে অন্তর্ভুক্তিকরণ নিশ্চিত করতে চাই৷ এখানে আমরা সহসা ঘরে বসে কিংবা শারীরিক পরিশ্রম ছাড়া সহজে কাজ করতে পারবো৷ এক্ষেত্রে সরকার ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষক সবার সহযোগিতা কামনা করি৷
নিউজক্রিকেট২৪: করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ নিয়ে আপনার বক্তব্য কি?
নূর নাহিয়ানঃ সচেতন হওয়া ছাড়া উপায় নেই৷ খামখেয়ালী করলে ক্ষতি হবে আমাদের সবার, ক্ষতি হবে বাংলাদেশের৷ তাই সবাইকে অনুরোধ করবো, আপনারা সবাই সরকার ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিধি-নিষেধগুলো মেনে চলুন৷ ঘরে থাকুন , নিরাপদে থাকুন৷
নিউজক্রিকেটঃ ভালো থাকবেন,আপনাকে অনেক ধন্যবাদ৷
নূর নাহিয়ানঃ আপনাকে ও নিউক্রিকেট২৪ এর পাঠকদের কে ধন্যবাদ জানাই৷
