আইসিসি ট্রফি জয়ের ২৩ বছর পূর্ণ হলো আজ

মোহাম্মদ সোহেল »

১৩ এপ্রিল, দিনটি বাংলাদেশ ক্রিকেটে নতুন সূর্য উদয়ের দিন। ১৯৯৭ সালের ১৩ এপ্রিল মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের কিলাত কেলাত মাঠে মেঘাচ্ছন্ন আকাশে উদিত হয়েছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের লাল সূর্য। ১৯৯৭ সালের এই ১৩ই এপ্রিল তৎকালীন পরাক্রমশালী স্টিভ টিকোলোর কেনিয়াকে ফাইনালে হারিয়ে বাংলাদেশ ঘরে তুলেছিল দেশের ক্রিকেটের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিরোপা আইসিসি সহযোগী দেশগুলোকে নিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়া আইসিসি ট্রফি। সেই সাথে জিতে নিয়েছিল ১৯৯৯ বিশ্বকাপ খেলার টিকেট। এরপর খুব দ্রুত পেয়েছিল ওয়ানডে ও টেস্ট স্ট্যাটাস। আজ ১৩ই এপ্রিল সেই ঐতিহাসিক জয়ের ২৩ বছর পূর্ণ হল।

এই ২৩ বছরে দেশের ক্রিকেট অনেকদূর এগিয়েছে। বাংলাদেশ এখন আইসিসির পূর্ণাঙ্গ সদস্য। দেশের সুর্যসন্তানরা এখন বিশ্বসেরাদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু সেই দিনের রফিক, আকরাম, বুলবুল, শান্ত, সুজন, আতহার আলীরা বাঙালীদের যে আনন্দের বন্যায় ভাসিয়েছিল তা বাঙালী জাতীর হৃদয়ে থাকবে আজীবন সতেজ। সেইদিন শান্তর প্যাডে বল লাগার সাথে সাথেই পাইলটের ভোঁ দৌড়, রান পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চৌধুরী জাফরুল্লাহ শারাফাতের মধুর চিৎকার, ‘এবং আইসিসি ট্রফি ১৯৯৭ সালের চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ’ বাঙালী জাতীর হৃদয় ছুঁয়ে দিয়েছিল। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, রুপসা থেকে পাথুরিয়া সারা বাংলাদেশ সহ কুয়ালালামপুরের মাঠে সেইদিন বাঁধভাঙ্গা উল্লাসে মেতে উঠেছিল বাংলাদেশের আপামর জনতা।

এর আগে সেমিফাইনালে বাংলাদেশ স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ২ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৭৩ রানে হারিয়ে ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা অঘটন ঘটানো কেনিয়ার। যারা অধিনায়ক মরিস উদুম্বের নেতৃত্বে দুর্দান্ত খেলে ফাইনাল নিশ্চিত করেছিল।

সেইদিন খেলা শুরুর আগে বৃষ্টি হওয়ায় ভারী আউটফিল্ডের সুবিধা নিতে টস জিতে বোলিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বাংলাদেশের অধিনায়ক আকরাম খান। শুরুতেই কেনিয়াকে চেপে ধরেন টাইগার পেসার সাইফুল ইসলাম। শুরুতেই কেনিয়ার উদ্ভোধনী ব্যাটসম্যান আসিফ করিমকে ১৫ রানের মাথায় উইকেট কিপার ওটিয়েনোকে আউট করে বাংলাদেশকে শুভ সূচনা এনে দেন। এরপর খালেদ মাহুমুদ সুজন, মোহাম্মদ রফিকদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ২৪১ রানে থামে কেনিয়ার ইনিংস। একপ্রান্ত আগলে রেখে ১৪৭ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেন স্টিভ টিকোলো। রফিক ৩টি, সাইফুল ও সুজন ২টি করে উইকেট নেন।

বৃষ্টি ভেজা মাঠ, অচেনা কন্ডিশন, ফাইনালের চাপ, ১১ কোটি মানুষের স্বপ্ন পূরণের প্রত্যাশা নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামার অপেক্ষায় টাইগাররা। কিন্তু বাধ সাজল মুষল ধারে বৃষ্টি, পুরো মাঠ পানিতে ভেসে গেল। সেইদিন আর বৃষ্টি থামেই নি। রিজার্ভ ডে অর্থাৎ পরেরদিন সকালেও বৃষ্টি। তৎকালীন বাংলাদেশ বোর্ড প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরী, খ্যাতিমান অভিনেতা হুমায়ূন ফরিদী সহ মাঠে উপস্থিত অনেক বাংলাদেশি। গ্রাউন্ডসম্যানদের অক্লান্ত পরিশ্রমে মাঠ হল খেলার উপযোগী। বাংলাদেশের সামনে ওভার কমে ২৫ ওভারে ১৬৬ রানের বিশাল টার্গেট দাঁড় করানো হল।

তবে ঐদিন বাংলাদেশের ম্যানেজম্যান্ট দিয়েছিল বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। দুর্জয়ের সাথে ওপেনিংয়ে পাঠানো হল হার্ড হিটার মোহাম্মদ রফিককে। রফিক ১৫ বলে ২৬ রানের এক ছোট ঝড় তুলেন কিলাত কেলাব মাঠে। অধিনায়ক আকরাম খাঁনের বল মাঠের বাইরে ফেলা বিশাল ছক্কা যেন বিশাল আনন্দের ঢেউ তুলেছিল বাংলার মানুষের হৃদয়ে। অবশেষে নানা নাটকীয়তার পর শেষ ওভারে প্রয়োজন হয় ১১ রানের। স্ট্রাইকে খালেদ মাসুদ পাইলট প্রথম বলেই হাঁকান বিশাল ছক্কা যা বাংলাদেশের জয়কে একপ্রকার হাতের মুঠোয় এনে দেয়। ইনিংসের শেষ বলে দরকার ১ রান। এর আগের বলে শান্তর জোরালো শট ভেজা মাঠে সীমানা ছাড়া হওয়ার আগেই আটকে যায়, যা থেকে দৌড়ে দুই রান নিতে সক্ষম হয় শান্ত-পাইলটরা। শেষ বল শান্তর প্যাডে বল ফাইন লেগে ফিল্ডারের হাতে। কিন্তু তার পাইলটের ভোঁ দৌড়, শান্ত-পাইলটের নিরাপদে উইকেটের প্রান্তবদল, রেডিওতে চৌধুরী জাফরুল্লাহ শারাফাতের জয়োধ্বনি দেশের মানুষকে দিয়েছিল অনাবিল আনন্দ। মাঠে উপস্থিত বাংলাদেশের সমর্থকদের বাধভাঙ্গা উল্লাস যেন মালয়েশিয়ার কিলাত কেলাত মাঠকে রুপ দিয়েছিল এক টুকরো বাংলাদেশের। বাংলাদেশ ক্রিকেট পেয়েছিল পূর্ণতা।

আজকের এইদিনে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সেই বীরদের যাদের দৃঢ় প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ ক্রিকেট আজকের এই স্বনামধন্য অবস্থানে।

নিউজটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »