নিউজ ক্রিকেট ২৪ ডেস্ক »
প্রথমবারের মতো কিউইদের মাটিতে ইতিহাস গড়ে ‘কিউই পাখিদের’ ডানা ভেঙ্গে অবিস্মরণীয় এক জয় তুলে নিয়েছে বাংলার শিকারীরা। যে কাজটি গত ১১ বছরে এশিয়ার কোন দল করে দেখাতে পারেনি, সেই কাজটিই দাপটের সাথে করে দেখিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। নিউজিল্যান্ডে “মাউন্ট মঙ্গানুইতে” যখন বাংলাদেশ দল ইতিহাস রচনা করে কিউইদের ৮ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে, মুহুর্তেই নিউজিল্যান্ড থেকে সেই আনন্দ মিছিল ছেয়ে যায় হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে সেই ইতিহাস রচয়িতাদের জন্মভূমি বাংলাদেশে। এমন ঐতিহাসিক জয়ে পর বাধভাঙ্গা উদযাপনে ফেটে পড়ে বাংলার ক্রিকেট সমর্থকরা। শীতের সকালের মিষ্টি রোদটা যেন তাসমান সাগর পাড়ি দিয়ে জয়ের আনন্দ নিয়ে বিসৃত হয়েছিল বাংলার পুরো ১ লক্ষ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গমাইল জুড়ে।
অভিশপ্ত ইনজুরির কারণে কিউই বধের সাক্ষী হতে পারেননি বাংলাদেশ জাতীয় দলের ওয়ানডে দলপতি তামিম ইকবাল খাঁন। ইনজুরির কারণে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চলতি টেস্ট সিরিজ খেলা হচ্ছে না তামিমের। আর তাই বাসায় “টিভি সেটের” সামনে বসে সতীর্থদের ইতিহাস গড়ার দৃশ্য দেখেছেন তামিম। এমন ঐতিহাসিক জয়ের সাক্ষী হতে পারেননি ইনজুরির কারণে সেটা তামিম মেনে নিয়েছেন, তবে উদযাপন? এমন জয়ের পর সতীর্থদের সাথের সেই বাধভাঙ্গা উদযাপন বঞ্চিত হওয়াটা কেন জানি সহজে মেনে নিতে পারছিলেন না চাটগাঁইয়া নবাব। খুব বেশি মিস করছিলেন ম্যাচ জয়ের পর উদযাপন, ড্রেসিং রুমের আমরা করবো জয়, আমরা করবো জয়” আমরা করবো জয় একদিন” এই ধ্বনি গুলো।
আর তাই ‘দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে’ হুটহাট সিদ্ধান্তে অভিনব উপায়ে ঐতিহাসিক এই জয় উদযাপনের পরিকল্পনা সাজিয়েছেন তামিম।
মিরপুরের সবুজ গালিছা কিংবা মিরপুরের উইকেট, নেট অনুশীলন থেকে শুরু করে ক্রিকেটারদের বাইশ গজের লড়াইয়ের সকল প্রস্তুতিতে যে মানুষ গুলোর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি, সেই মানুষ গুলোর কথা ক’জনই বা জানেন কিংবা ভাবেন?
আজকের ম্যাচে ওরা যেই ১১ জন ইতিহাস গড়েছেন নিউজিল্যান্ডের মাটিতে, তাদের ডেরা তো এই মিরপুরের শেরে-বাংলা স্টেডিয়াম। এখানকার আলো বাতাস ও মাঠকর্মীদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সাজানো মিরপুর শেরে-বাংলার ময়দান থেকেই তো নিজেদের তৈরি করে নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট মঙ্গানুইতে বসিয়েছেন বাঘের থাবা। পর্দার আড়ালের এই হিরো গুলোর অক্লান্ত পরিশ্রমের গল্পটা ক’জনই বা জানেন?
আর তাই তামিম এবার তার অভিনব উদযাপন পরিকল্পনায় রেখেছেন মিরপুরের শেরে-বাংলা স্টেডিয়ামের মাঠকর্মীদের। নিউজিল্যান্ডে সতীর্থদের সাথে বিজয় উল্লাস করতে না পারার আক্ষেপ গুছিয়েছেন পর্দার আড়ালের হিরো মিরপুরের মাঠ কর্মীদের সঙ্গে উদযাপন দিয়ে।
বর্তমান বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নদের দাপটের সাথে হারানোর আনন্দ উদযাপনের জন্য তামিম বেছে নিয়েছেন মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের ৪০ জন মাঠকর্মীকে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আয়োজন করেছেন রাতের খাবারের। আনন্দ,উল্লাস ও নিজেদের মধ্যে খুনসুটিতে নিউজিল্যান্ডের সেই ঐতিহাসিক জয়ের সুবাতাস নিয়েছেন এই হিরোদের নিয়েই।
অভিনব প্রন্থায় মিরপুরের মাঠকর্মীদের সঙ্গে ঐতিহাসিক জয় উদযাপনের ব্যাপারে নিজের ভ্যারিফাইড ফেসবুক অফিশিয়াল পেজ থেকে তামিম জানিয়েছেন এমন ভিন্নধর্মী উদযাপনের প্রকৃত কারণ।
মাঠকর্মীদের রাত্রীকালীন ভোজের একটি খন্ড ভিডিও ও সবার একটি যৌথ ছবি যুক্ত করে তামিম লিখেছেনঃ
বাংলাদেশ ক্রিকেটের আজকে স্মরণীয় একটি দিন। টেস্টের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের আমরা হারিয়ে দিয়েছি তাদের মাঠেই। দেশের ক্রিকেটে এমন দিন খুব কমই পেয়েছি আমরা। আমাদের দল যেমন সেখানে উচ্ছ্বাস-উল্লাসে উদযাপন করেছে, দেশেও সবাই নিজেদের মতো করে উদযাপন করছি। আমি উদযাপনের জন্য বেছে নিয়েছি এমন মানুষদের, যারা বাংলাদেশ ক্রিকেটের আনসাং হিরো।
এই ছবিতে যাদের দেখছেন, তারা সবাই মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামের মাঠকর্মী। আজকে উদযাপনে আমার সঙ্গী ছিলেন তাদের ৪০ জন। আমরা একসঙ্গে ডিনার করেছি, মজা করেছি, আনন্দময় সময় কাটিয়েছি। আজকের জয়কে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করার চেষ্টা করেছি।
অনেকে ভাবতে পারেন, আমরা ম্যাচ জিতলাম নিউ জিল্যান্ডে, এখানে মিরপুরের মাঠকর্মীদের ভূমিকা কী! কিন্তু আমরা যারা ক্রিকেটার, তারা জানি, কতটা কষ্ট এই মানুষগুলি করেন। রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে বছরজুড়ে তারা আমাদের প্রস্তুতির জন্য কাজ করে যান। আমরা যখন নেটে ঘাম ঝরাই, আড়ালে থেকে আরও বেশি ঘাম ঝরিয়ে যান এই মানুষগুলি। পরিবার-পরিজন ছেড়ে তারা দিনের পর দিন মাঠে পড়ে থাকেন এবং অক্লান্ত পরিশ্রম করেন যেন আমাদের প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি না থাকে। আমরা যখন এবং যেভাবে চাই, তারা উইকেট ও মাঠ প্রস্তুত রাখেন। আমাদের যে কোনো সাফল্যের ভাগীদার তারাও।
সবাই ভালো থাকবেন। সুসময় ও দুঃসময়ে দলের পাশে থাকবেন এবং এই মানুষগুলির জন্য ও বাংলাদেশ ক্রিকটের জন্য দোয়া করবেন।
সবার জন্য শুভকামনা।
নিঃসন্দেহে তামিম ইকবালের এমন ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন মন ছুয়ে যাওয়ার মতোই। এছাড়া, মাঠ কর্মীদের প্রতি তামিমের এমন ভালবাসা ও আন্তরিক মনোভাব নতুন কিছু নয়। মিরপুরের সকল মাঠ কর্মীদের পাশে সবসময় ছায়া হয়েই থাকেন তামিম। নিজ জায়গা থেকে সবসময় প্রয়োজন অনুযায়ী এদের সহযোগীতা করে আসছেন বহুদিন ধরেই। এর আগেও করোনার প্রকোপের সময় মাঠ কর্মীদের পাশে ছায়া হয়ে ছিলেন তামিম।তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে যেকোনো মাঠকর্মীর পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সমস্যা গুলোতে তামিমের সহযোগীতার গল্প গুলো কারোই অজানা নয়। এমন উধার মনোভাবের জন্যই হয়তো মাশরাফি আদর করে নাম দিয়েছেন কলিজাওয়ালা খান।

