নিউজ ক্রিকেট ২৪ ডেস্ক »
ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়, মানুষের মনের জোর’ই সফলতার সবচাইতে বড় হাতিয়ার। কথা গুলো আরো একবার প্রমাণ করেছে বাংলাদেশ শারিরিক প্রতিবন্ধী (ফিজিক্যাল চ্যালেঞ্জড) ক্রিকেট দল। শারিরিক প্রতিবান্ধকতাকে জয় করে বুকভরা স্বপ্ন ও অধম্য সাহস নিয়ে বাইশ গজ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে একদল স্বপ্নবাজ তরুণ। অথচ এরা কেউ আপনার আমার মতো পূর্ণাঙ্গ শারিরীক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অধিকারী নয়! কারো নেই হাত, কারো নেই পা, কারো কারো সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা নেই জন্মগত ভাবেই। কেউ কেউ হামাগুড়ি দিয়ে ছুটছেন বলের পিছনে! এসব শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে লাল-সবুজের পতাকার প্রতিনিধিত্ব করছেন নিঃস্বার্থ ভাবে।

বলছি অবাক বাংলাদেশ গোল্ডেন সিটিজেন ফাউন্ডেশনের হাতে গড়া বাংলাদেশ ফিজিক্যাল চ্যালেঞ্জড ক্রিকেট দলের কথা। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি হয়তো জানেই না, নিজেদের উদ্যোগে একদল হার না মানা তরুনদের সমন্বয়ে বাংলাদেশ ডিজেবল ক্রিকেট দল রয়েছে দেশে। এদিক ওদিক থেকে ধারদেনা করে দেশ-বিদেশ ঘুরে দেশের হয়ে খেলে যাচ্ছে দলটি। শুধু খেলেই যাচ্ছে না, বাংলাদেশের নামটি উজ্জ্বল করছে বিশ্ব দরবারে। এই তো গত ২ দিন আগের কথা, ভারতের মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট ম্যাচ জিতে আন্তর্জাতিক ডিজেবল ক্রিকেটের ইতিহাসের অভিষেক টেস্ট ম্যাচে ইতিহাস রচনা করেছে বাংলার ছেলেরা।

অবাক বাংলাদেশ গোল্ডেন সিটিজেন ফাউন্ডেশন নামক একটি সেচ্ছাসেবী ফাউন্ডেশনের ব্যানারে ঋন করে, সেই ঋনের অর্থে ভারত সফরে গিয়ে দেশের জন্য বিরাট এই সুনাম বয়ে নিয়ে এসেছে শারিরীক প্রতিবন্ধী বাংলার এই সাহসী ছেলেরা। ৯০০ কোটি টাকার মালিক বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) হয়তো জানেই না তাদের এই সংগ্রামের গল্প! তাদের এই অনন্য অর্জনের গল্প।
ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জ ক্রিকেট ইতিহাসের ঐতিহাসিক প্রথম টেস্ট ম্যাচ মাঠে গড়িয়েছে ভারতের হায়দ্রাবাদের লাল বাহাদুর ক্রিকেট গ্রাউন্ডে।ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জ ক্রিকেট ইতিহাসের
প্রথম আন্তর্জাতিক টেস্ট ম্যাচে স্বাগতিক ভারতকে ইনিংস ও ১০ রানের ব্যবধানে পরাজিত করে ইতিহাস গড়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।

ভারতের ডিজেবল ক্রিকেট বোর্ড (বিডিসিএ) কর্তৃক আয়োজিত দুই দেশের এই এই পুর্নাঙ্গ সিরিজ গুলো অনুষ্ঠিত হচ্ছে ভারতের হায়দ্রাবাদের লালমোহন ক্রিকেট স্টেডিয়ামে।
গত ২ অক্টোবর (মঙ্গলবার) আন্তর্জাতিক ডিজেবল ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ম্যাচে স্বাগতিক ভারতের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ ফিজিক্যাল চ্যালেঞ্জড ক্রিকেট দল। ঐতিহাসিক এই ম্যাচে টসে জিতে আগে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক শিহাব মন্ডল। অধিনায়কের সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করতে খুব একটা সময় নেননি বাংলাদেশী বোলাররা।টসে হেরে আগে ব্যাট করতে নেমে, বাংলাদেশ দলের বোলিং আক্রমনের দুই সেনাপতি, মনির ও ভবেনের বিধ্বংসী বোলিং তোপে শুরু থেকেই নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে স্বাগতিকরা। প্রথম ইনিংসে বল হাতে বাংলাদেশের হয়ে মনির নেন ৪ টি ও ভবেনের শিকার ৩ উইকেট। টাইগার বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করে মাত্র ১৪০ রান তুলতেই প্রথম ইনিংসে অলআউট হয় ভারত।
স্বাগতিকদের দেওয়া প্রথম ইনিংসের ১৪০ রানের জবাবে ব্যাট নিজেদের প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নামে বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে জাবেদ-শাওনের জোড়া অর্ধশতক ও ভবেনের ৪৯ রানের কল্যানে টাইগারদের প্রথম ইনিংস থামে ২৩৪ রানে। জাবেদের ব্যাট থেকে আসে ৫৫ রানের দারুণ একটি ইনিংস, এছাড়া ব্যাট হাতে শাওন খেলেন ৫১ রানের ইনিংস। বল হাতে ৩ উইকেট নেওয়া অলরাউন্ডার ভবেন ছিলেন ব্যাট হাতেও সমান উজ্জ্বল।অর্ধশতক থেকে মাত্র ১ রানের আক্ষেপ নিয়ে ব্যক্তিগত ৪৯ করে ফিরে যান তিনি। প্রথম ইনিংসে জাবেদ,শাওন ও ভবেনের ব্যাটে চড়ে বাংলাদেশ ফিজিক্যাল চ্যালেঞ্জড দল পায় ৯৪ রানের লিড। ৯৪ রানে পিছিয়ে থেকে নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামে স্বাগতিক ভারত।
দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশী বোলাররা যেন হয়ে উঠলো আরো হিংস্র! প্রথম ইনিংসে বল হাতে উজ্জ্বল মনির দ্বিতীয় ইনিংসে এসে হয়ে উঠলেন প্রতিপক্ষের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক। দ্বিতীয় ইনিংসে মনিরের বিধ্বংসী বোলিংয়ের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি কোন ভারতীয় ব্যাটসম্যান। প্রথম ইনিংসে বল হাতে ৪ উইকেট নেওয়া মনির দ্বিতীয় ইনিংসে লুপে নেন প্রতিপক্ষের মুল্যবান ৬ উইকেট। এছাড়া প্রথম ইনিংসে ৩ উইকেট নেওয়া আরেক বোলার ভবেন এই ম্যাচেও নিজের শিকারে পরিনত করেন প্রতিপক্ষের ৩ ব্যাটসম্যানকে। মনির-ভবেনের বিধ্বংসী বোলিংয়ের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করা ভারতীয় দলের ইনিংস থামে মাত্র ৮৪ রানে।যার ফলে এক ইনিংস হাতে রেখে ১০ রানের ব্যবধানে ম্যাচ জিতে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ ফিজিক্যাল ডিজেবল ক্রিকেট দল। বল হাতে দুই ইনিংসে ১০ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের মনির হোসেন।

ডিজেবল ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম আন্তর্জাতিক টেস্ট ম্যাচে এমন দাপটের সাথে জয়লাভ করে দারুণ খুশি বাংলাদেশ ফিজিক্যাল ডিজেবলড টিমের চ্যাম্পিয়ন ক্রিকেটাররা। অবাক বাংলাদেশ গোল্ডেন সিটিজেন ফাউন্ডেশনের আন্তরিক সহযোগীতায় খেলতে আসা দলটি তাদের আস্থার প্রতিদান দিতে পেরে দারুণ খুশি।
ঐতিহাসিক এই জয়ের পর “নিউজক্রিকেট টোয়েন্টিফোরকে” বাংলাদেশ ফিজিক্যাল চ্যালেঞ্জড দলের অধিনায়ক শিহাব মন্ডল নিজেদের অনুভূতি জানাতে গিয়ে বলেনঃ বাংলাদেশ বনাম ভারত এর ফিজিক্যাল চ্যালেঞ্জ ক্রিকেটারদের ঐতিহাসিক টেস্ট ম্যাচে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক হতে পেরে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। আমরা টসে জিতে ভারতকে ব্যাটিংয়ে পাঠাই, আমার টিমের মনির ও ভবেন আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী বোলিং করতে সক্ষম হয় প্রথম ইনিংস থেকেই। পরে আমার টিম ব্যাটিংয়ে এসে জাবেদ ও সাওনের হাফসেঞ্চুরিতে প্রথম ইনিংসে আমরা ২৩৪ রান করি। পরে মনির এর অন্যবদ্য বোলিংয়ে আমরা জয় পাই। এই জয়ের পিছনে আমার দলের সবার অবদান ব্যাপক।আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই BDCA ইন্ডিয়া কে যারা এত সুন্দর একটি সিরিজ আয়োজন করছে।
তিনি আরো যোগ করেনঃ
আমরা আমাদের এই ঐতিহাসিক প্রথম জয়টি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে তার সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উপহার হিসাবে প্রদান করতে চাই। আমাদের অবাক বাংলাদেশ গোল্ডেন সিটিজেন ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ সোহেল রানা, ও সভাপতিঃ জেবুনাহার ম্যাম টাকা ঋন করে আমাদের এই যায়গায় নিয়ে এসেছেন দেশের জন্য প্রতিনিধিত্ব করতে। উনাদের আস্থার প্রতিদান দিতে পেরে আমাদের ভাল লাগছে।
<span;>আমরা আমাদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাই, আরো ভাল কিছু উপহার দিতে চাই দেশকে।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের অভিভাবক বিসিবির ছায়াতলে আশ্রয় পাওয়ার আকুতি নিয়ে অধিনায়ক আরো বলেনঃ আমাদের এই স্বপ্নযাত্রা যাতে থেমে না যায়, সেইজন্য আমরা চাই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি আমাদের দিকে একটু সুনজরে তাকাক।দেশের ক্রিকেট বোর্ড এর সাপোর্ট ব্যাতিত আমাদের স্বপ্নযাত্রা অব্যহত রাখা হয়তো সম্ভব হবে না।নিউজক্রিকেট টুয়েন্টফোরের মাধ্যমে আমরা আকুল আবেদন জানাতে চাই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কাছে, তারা যেন আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায়, আমাদের যেন সীকৃতি দেয়।দেশবাসীর কাছে আমরা দোয়া চাই, যেন শারিরীক এই প্রতিবান্ধকতা জয় করে আমরা দেশের জন্য আরো সুনাম বয়ে নিয়ে আসতে পারি।
সংক্ষিপ্ত স্কোরঃ
টসে জিতে ফিল্ডিংয়ে বাংলাদেশ।
ভারত (১ম ইনিংস): ১৪০-১০
বাংলাদেশ (প্রথম ইনিংস): ২৩৪-১০
ভারত (দ্বিতীয় ইনিংস): ৮৪-১০
ফলাফল বাংলাদেশ ইনিংস ও ১০ রানে জয়ী।
ম্যাচ সেরাঃ মোহাম্মদ মনির হোসেন (৪৯ রান, ১০ উইকেট)
নিউজক্রিকেট টুয়েন্টিফোর || মারুফ ইসলাম ইফতি
<span;>

