নিউজ ক্রিকেট ২৪ ডেস্ক »
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজে ছন্দে ছিলেন তাসকিন আহমেদ।ডেনিডেন, হ্যাগলি ওভাল থেকে ওয়েলিংটন এর বেসিন রিজার্ভে তাসকিন ছিলেন দূর্দান্ত। গতি, নিয়ন্ত্রণ, সুইং, কাটার, বাউন্স, আগ্রাসন, সব মিলিয়ে বিধ্বংসী বোলিংয়ে নিউজিল্যান্ডকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
পরিশ্রম সৌভাগ্যের চাবিকাঠি, প্রবাদ বাক্যে নয়,বাস্তবে প্রমান করতে হলে অবশ্যই দূর্গম গিরিপথ পাড়ি দিতে হবে কঠোর পরিশ্রম এবং লড়াইয়ে মাধ্যমে। অন্ধকারে থেমে থাকা নয়, বরং আলোর খোঁজে সামনে এগিয়ে চলাই একজন পথিকের লক্ষ্য হওয়া উচিত। নয়তো সময়ও তাহার সঙ্গ ত্যাগ করবে এটাই নিয়তি। হেরে গিয়ে থেমে থাকলে জয়ের স্বাদ নেওয়া যেমন আকাশ কুসুম কল্পনা, তেমনি ব্যর্থতা নিয়ে পরে থাকলে সফলতা তার জন্য বিলাসিতা। তাসকিন আহমেদ কঠিন, লড়াই এবং পরিশ্রম দিয়ে ফিরেছেন আলোর মশাল হাতে। লক্ষ্য এবার নিজেকে আলোকিত করার!
তাসকিন আহমেদ বাংলাদেশ ক্রিকেটে আগমনি বার্তায় রেখেছিলেন অপ্রতিরোধ্য ঝড়ের আভাস। সেই ঝড়ে চারপাশ লন্ডভন্ড করতেও সময় লাগেনি তার। এক কথায় হইচই পরে যাওয়ার মতো এতো ভয়ংকর, খুবই ভয়ংকর একজন। চারপাশে ছড়িয়ে পরলো সেই আতঙ্ক। দীর্ঘদেহী এক টগবগে তরুন বল হাতে বাংলাদেশের হয়ে ঝড় তুলছেন ২২ গজে। হুংকার দিচ্ছিলেন তারন্যের। ফাস্ট বোলিংয়ে প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের কুপোকাত করতেন নিমেষেই। যেকোনো উইকেটে গতির ঝড় তুলে ব্যাটসম্যানদের বুকে কাঁপন ধরাতে পারতেন তিনি। তার শরীরী ভাষা এবং হার না মানা লড়াকু মানসিকতা সব সময় প্রতিপক্ষ থেকে এগিয়ে রাখতো। তার বলে শুধু গতি-ই নয়, বরং সঠিক লাইন-লেংথ, টাইট অ্যাকুরেসি এবং নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে এক আদর্শ ফাস্ট বোলারের উপস্থিতি ছিল।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আগমনের পর দারুণভাবে আগাচ্ছিল তার ক্যারিয়ার গ্রাফ। প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছেন তিনি। হঠাৎ করে একটা দমকা ঝড় এসে লন্ডভন্ড করে দেন তাসকিনকে। ২০১৬ -টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তার বোলিং অ্যাকশন অবৈধ ঘোষণা করা হলে হোঁচট খান তাসকিন। সেই সাথে ইনজুরি আর নিজের প্রতি উদাসীনতায় তাসকিন নিজেকে অন্ধকারে হারিয়ে ফেলেন। তারপর যখন নিজের গুরুত্ব বুঝতে পারেন, তখন নিজেকে ফিরে পেতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তিনি। কখনো উত্তাপ্ত বালুর মাঠে, কখনো বা জ্বলন্ত কয়লার আগুনে হেঁটে গিয়ে। নিজেকে মানসিক এবং শারীরিকভাবে আরও ধারালো করে ফিরছেন আলোর মঞ্চে!
ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে নিউজিল্যান্ড-বাংলাদেশের ওয়ানডে সিরিজের সেরা বোলার হতে পারতেন তাসকিন আহমেদ। বল হাতে সমার্থ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টাই করেছেন তিনি। বিশেষ করে নতুন বলে আগুন ঝড়া বোলিং করেছেন তিনি। কিন্তু সতীর্থদের ব্যর্থতা বিশেষত মিস ফিল্ডিংয়ের কারণে তাসকিনের প্রত্যাবর্তন হয়নি মনে রাখার মত। পরিসংখ্যানে তাসকিনের ফেরা মনের মনের মতো না হলেও তাসকিনের কামব্যাক আসা দেখাচ্ছে বাংলাদেশকে।
তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের তিন ম্যাচেই পাওয়া প্লেতে তাসকিনের হাতে বল তুলে দিয়েছিলেন দলীয় ক্যাপ্টেন তামিম ইকবাল। তিন ম্যাচেই দূর্দান্ত কিছু স্পেল শেষ করেছেন তাসকিন। প্রথম ম্যাচে ৪ ওভার বল করে ২৩ রান দিয়ে পেয়েছিলেন ১ উইকেট। ৪ ওভারের মাঝে ১২ টি ডট বল করতে পেরেছেন তিনি। ছোট লক্ষ্য সহজেই তারা করে ফেলে নিউজিল্যান্ড। যার কারনে দ্বিতীয় স্পেলে আসা হয়নি তার।
দ্বিতীয় ম্যাচে হ্যাগলি ওভালে মোস্তাফিজুর রহমান এর সাথে নতুন বলে ইনিংস শুরু করেন তাসকিন। পাওয়ার প্লেতে ৪ ওভারের স্পেলে খরচ করেন মাত্র ২১ রান। পরের স্পেলে ২ ওভারে আরও খরচ করেছেন ১১ রান। ৬ ওভারে ৩২/০ থেকে নিউজিল্যান্ডের চাপের মাঝে শেষ স্পলে খরুচে বোলিং করেন তিনি। ১০ ওভারের স্পেলে ৬৭ রানে উইকেট শূন্য থাকতে হয় তাকে। যদিও তার বলে একাধিক সুযোগ এসেছিল।
তৃতীয় ম্যাচে হোয়াইটওয়াশ এড়ানোর ম্যাচে তাসকিন আর রুবেলের আগুন ঝড়া বোলিংয়ে কেঁপে ওঠে নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিং লাইনআপ। এদিন নিজের করা চতুর্থ ওভারেই হেনরি নিকোলস এর উইকেট তুলে নেন তাসকিন। প্রথম স্পেলে টানা ৭ ওভার বল করেন তাসকিন। সাত ভারতের স্পেলে তাসকিনের বোলিং ফিগার ছিল এরকম ৭-১-২৭-১। দ্বিতীয় স্পেলে পাওয়ার প্লের শেষ ১০ ওভারে ৩ ওভার বল করে ২৬ রান খরচ করেন তিনি। ১০ ওভার শেষে তার বোলিং ফিগার দাঁড়ায় ১০-০১-৫২-১।
ওয়ানডে সিরিজের ধারা বজায় রাখেন টি টোয়েন্টি সিরিজেও। তিন ম্যাচ টি টোয়েন্টি সিরিজের প্রথম ম্যাচে একাদশে সুযোগ না পেলেও দ্বিতীয় ম্যাচে অসাধারণ বোলিং করেন তিনি। যদিও ফিল্ডিং ব্যর্থতায় একটু খরুচে হয়ে যায়। ৩.৫ ওভার বল করে ৪৯ রানে ১ উইকেট পেয়েছিলেন তিনি। পুরো ম্যাচে দূর্দান্ত কিছু ডেলিভারিতে নজর কারনে তাসকিন। বৃষ্টি বিঘ্নিত শেষ ম্যাচে ১০ ওভারে খেলা গড়ালে ২ ওভারে ২৪ রান দিয়ে ১ উইকেট নিয়েছেন তাসকিন। নিউজিল্যান্ডের পাহাড়সম রানের বিপরীতে তাসকিন ছিলেন দূর্দান্ত।
ওয়ানডে সিরিজে তিন ম্যাচে পেয়েছেন মোটে ২ উইকেট। টি টোয়েন্টি তে ২ ম্যাচে পেয়েছেন ২ উইকেট।পুরো সিরিজে পরিসংখ্যান পক্ষে কথা না বললেও তাসকিন প্রশংসা কুড়িয়েছেন প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের কাছ থেকেও। পুরো সিরিজে অসাধারন ব্যাটিং করে ম্যান অব দ্যা সিরিজ পুরস্কার জেতা ডেভন কনওয়ে তাসকিনের বোলিংয়ের প্রশংসা করেছিলেন। নিউজিল্যান্ড ব্যাটসম্যান জানিয়েছিলেন নতুন বলে তাসকিনকে মোকাবেলা করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে।নতুন বলে তাসকিন সত্যিই খুব ভালো বল করেছে।
জাতীয় দলের হয়ে এখন পর্যন্ত ৩৬ ওয়ানডে, ২১ টি টোয়েন্টি এবং ৫ টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন তাসকিন। ওয়ানডেতে ৪৮, টোয়েন্টি তে ১৪ এবং ৭ টি টেস্ট উইকেট নিয়েছেন তিনি।
কঠোর পরিশ্রম দিয়ে তাসকিন যেভাবে ফিরে এসেছেন তাতে ছন্দ ধরে রাখতে পারলে আগামি কয়েক বছর বাংলাদেশ দলকে সার্ভিস দিতে পারবেন এটাই প্রত্যাশা। সে জন্য অবশ্যই তাকে সঠিক যত্ন এবং পরিচর্চায় রাখতে হবে। বাংলাদেশ দলের এই গতি তারকা নিজের ছন্দে থাকলে যেকোনো দলের জন্য হুমকি হতে পারেন। বিশেষ করে বিদেশের দ্রুতগতির উইকেটে তাসকিন হতে পারেন বেস্ট অপশন। সূদুর ভবিষ্যৎ বলা মুশকিল তবে এই মূহুর্তে দূর্দান্ত কামব্যাক করেছেন তাসকিন আহমেদ!
নিউজক্রিকেট/ রাসেল।
