গাজী নাসিফুল হাসান »
ক্রিকেট আমাদের বিনোদনের এক বড় মাধ্যম। ক্রিকেট আমাদের আনন্দের এক বড় উৎস। আমরা ক্রিকেট দেখে তৃপ্তি পাই। অনেকের কাছেই ক্রিকেট যেন জীবন। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ৩১ শেষ মার্চ যদি ক্রিকেটে শুরুটা না হতো তবে আজ আমাদের কাছে এই ক্রিকেট কোনো অর্থ বহন করতো না। আমাদের কাছে ক্রিকেট যেন সোনার হরিণ তবে ৩৪ বছর আগে সেই শুরুটা যাদের হাত ধরে শুরু হয়েছিলো তাদের কি আমরা ভুলে গিয়েছি? মনে হয় হাতে গোনা দুই একজন বাদে সবাই হয়তো ভুলে গিয়েছি। ১৯৮৬ সালের ৩১শে মার্চ বাংলাদেশ পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশ দলের সেই সোনালী দিন যে দিন না আসলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের শুরু হতো না। সেই ম্যাচটিতে যেই ১১ জন সৈনিক মাঠে নেমেছিলো আজ তারা কি করছো? কোথায় তারা? কিভাবে দিন অতিবাহিত করছে। আমরা হয়তো জানি না। আসুন জানার চেষ্টা করি তারা কেমন আছেন-
গাজী আশরাফ হোসেন লিপু:
গাজী আশরাফ হোসেন লিপু ছিলেন সেই ম্যাচের অধিনায়ক। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ওয়ানডে ইতিহাসের প্রথম অধিনায়ক তিনি। তবে
পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে ওয়াসিম আকরামের বলে বোল্ড হয়ে শূন্য রানে আউট হয়ে ফিরে যান লিপু। আর বল হাতে জাভেদ মিয়াঁদাদের উইকেট নেন। এরপর তিনি আরো ৬টি ম্যাচে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। লিপু ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে গিয়েছেন ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত। খেলা ছাড়লেও ক্রিকেটকে ছাড়েননি আশরাফ হোসেন লিপু। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ যে আইসিসি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলো সেই দলের ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছেন লিপু। এরপর বিসিবির পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। এখন ঢাকাতে ব্যবসা করছেন। পাশাপাশি টেলিভিশনে তাকে ক্রিকেট বিশ্লেষণ করতে দেখা যায়। আর মাঝে মধ্যে পত্র পত্রিকায় কলাম লিখেন।
রকিবুল হাসান:
রকিবুল হাসান বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮৪ সালে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ান টুর্নামেন্টে যে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাংলাদেশ মূল এশিয়া কাপে সুযোগ পেয়েছিলো বাংলাদেশ সেই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রকিবুল হাসান। সেই ম্যাচে মাত্র ১৪ রান করেছিলেন রকিবুল। ৩৪ বছর পরও নিজেকে ক্রিকেটের সাথে জড়িয়ে রেখেছেন। এছাড়া বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কোচ, ম্যানেজার ও নির্বাচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। বর্তমানে বিসিবির প্যানেলভুক্ত ম্যাচ রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রকিবুল হাসান। এছাড়া টেলিভিশনে ক্রিকেট বিশ্লেষণ ও পত্রিকাতে কলাম লিখা চালিয়ে যাচ্ছেন।
নুরুল আবেদীন:
নুরুল আবেদীন পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই ম্যাচে রকিবুল হাসানের ওপেনিং সঙ্গী হিসেবে নেমেছিলেন। তবে ভালো করতে পারেননি। শূন্য রান করে আউট হন নুরুল আবেদীন। তবে এশিয়া কাপের আগে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে নজর কেড়েছিলেন। নুরুল আবেদীন হচ্ছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু্র বড় ভাই। তবে নুরুল আবেদীন জাতীয় দলে ভালো না করলেও সফল ছিলেন ঘরোয়া ক্রিকেটে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামে রয়েছেন। চট্টগ্রামে বিসিবির বিভাগীয় কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
শহীদুর রহমান:
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ওয়ানডে ইতিহাসের প্রথম ম্যাচে সর্বোচ্চ ৩৭ রান করেছিলেন এই শহীদুর রহমান। শহীদুর রহমান অবশ্য এখন ক্রিকেটের সাথে জড়িয়ে নেই। তিনি এখন নিভৃত জীবন যাপন করছেন। তিনি এখন চট্টগ্রামে থাকেন। একাধিক ব্যবসা রয়েছে তার।
মিনহাজুল আবেদীন নান্নু:
দেশের ইতিহাসের প্রথম ওয়ানডেতে দুই ভাইয়ের অভিষেক হয়েছিলো। নুরুল আবেদীন ও তার ছোট ভাই মিনহাজুল আবেদীন নান্নু। মিনহাজুল আবেদীন নান্নু পরবর্তীতে দেশের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যানের তকমা লাগালেও অভিষেক ওয়ানডে রাঙাতে পারেননি। ৬ রান করে আউট হয়েছিলেন তিনি। দেশের প্রথম বিশ্বকাপে ব্যাট হাতে ছিলেন সেরা পারফরমার। বর্তমানে তিনি দেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রধান নির্বাচকের দায়িত্ব পালন করছেন।
রফিকুল আলম:
আশির দশকে অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান ছিলেন এই রফিকুল আলম। তবে অভিষেকে মাত্র ১৪ রান করেছিলেন তিনি। যদিও পরবর্তীতে রফিকুল নিজেকে ক্রিকেটে নানাভাবে নিয়োজিত রেখেছিলেন। দীর্ঘদিন তিনি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের নির্বাচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১১ বিশ্বকাপে তিনি জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রধান নির্বাচক ছিলেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে থাকছেন তিনি। বর্তমানে ক্রিকেট থেকে সম্পুর্নভাবে নিজেকে দূরে রেখেছেন তিনি।
গোলাম ফারুক:
আশি নব্বই দশকের অন্যতম প্রধান অলরাউন্ডার ছিলেন এই গোলাম ফারুক। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলে খেলেছেন ১৯৯২ সাল পর্যন্ত। অভিষেক ওয়ানডেতে রফিকুল আলমের সঙ্গে একটি ছোট দুটি গড়েছিলেন তিনি। তবে রান করেছিলেন মাত্র ১৪। ক্রিকেট খেলা ছেড়ে দিলেও ক্রিকেটের মায়া ত্যাগ করতে পারেননি। বিসিবির সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি কোচ হিসেবে। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্টের অংশ হাই পারফরম্যান্স টিমের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
জাহাঙ্গীর শাহ বাদশাহ:
দেশের ক্রিকেটের সেই সময়কার সেরা অলরাউন্ডার ছিলেন এই জাহাঙ্গীর শাহ বাদশাহ। বাংলাদেশের হয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রথম উইকেট শিকারি তিনি। সেই ম্যাচে ব্যাট হাতে ব্যর্থ হলেও বল হাতে ছিলেন দুর্দান্ত। খেলা ছেড়েছেন অনেক দিন আগেই। বিসিবির সাথে সেইভাবে জড়িত ছিলেন না। টেলিভিশনে কিছু সময় ক্রিকেট বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করলেও বর্তমানে ঢাকায় নিভৃত জীবন যাপন করছেন।
হাফিজুর রহমান:
অভিষেক ওয়ানডে ম্যাচে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের উইকেট রক্ষক ব্যাটসম্যান ছিলেন এই হাফিজুর রহমান। তার ক্যাচেই জাভেদ মিয়াঁদাদ আউট হয়েছিলেন। তবে দেশের হয়ে মাত্র দুইটি ওয়ানডে খেলেছেন এই হাফিজুর রহমান। বর্তমানে তিনি প্রবাসে জীবন যাপন করছেন যুক্তরাষ্ট্রে।
গোলাম নওশের:
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অভিষেক ওয়ানডেতে বাংলাদেশ দলের মূল বোলার ছিলেন তিনি। নতুন বল হাতে নিয়েছিলেন এই গোলাম নওশের। বাঁহাতি পেসার গোলাম নওশের বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের হয়ে খেলেছেন ১৯৯২ সাল পর্যন্ত। খেলা ছাড়লেও বিসিবির সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি। অনেকদিন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের নির্বাচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন।
সামিউর রহমান:
নতুন বল প্রথম হাতে নিয়েছিলেন গোলাম নওশের। আর গোলাম নওশেরের সঙ্গী হিসেবে সামিউর রহমান বোলিং করেছেন। আর বোলিংটাও ভালো করেছেন তিনি। ৭ ওভার বোলিং করে মাত্র ১৫ রান দেয়া চাট্টিখানি কথা নয়। খেলা ছেড়ে দিয়েছেন অনেক আগে। ক্রিকেটটাকে ছাড়তে পারেননি এখনো। তাই তো ক্রিকেটের সাথে লেগে রয়েছেন তিনি। বিসিবির প্যানেলভুক্ত রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
বাংলাদেশ ক্রিকেটে বর্তমানে আমরা সাকিব , তামিম, মুশফিক, মাশরাফি, মাহমুদুল্লাহ এর মতো অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটার বাংলাদেশ পেয়েছে। তবে বাংলাদেশের এই খেলোয়াড়রা যারা সেদিন ৩৪ বছর আগে শুরু করেছিলো তাদের শুরুটা না হলে আজ এ পর্যায়ে বাংলাদেশ আসতে পারতো না। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের এই রত্নদের অবদান কখনোই ভুলবার নয়।
