দুর্জয় দাশ গুপ্ত »
বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের সিলেট পর্ব শেষ হয়েছে দিন কয়েক আগেই। বিপিএলের এই আসরে ৩ দিনে মোট ৬ টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। সময়টা মাত্র ৭২ ঘন্টা হলেও সাথে নিয়ে ফিরেছি অসংখ্য মুহূর্ত। শহরের যান্ত্রিকতাগুলো ফেলে দিয়ে এসেছি চা বাগানে মোড়ানো স্টেডিয়াম এলাকায়৷
মূল সড়ক থেকে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পথ পুরোটাই চা বাগানে ঘেরা, চারিদিকে সবুজের এক বিশাল সমারোহ। যেন প্রকৃতি তার দু’হাতে ভরে দিয়েছে গোটা স্টেডিয়াম এলাকা৷
সিলেট শহর থেকে স্টেডিয়াম পর্যন্ত আসতে চোখে পড়বে একদিকে উচুঁ নিচু টিলা, অন্যদিকে দিগন্ত বিস্তৃত চা-বাগান। এক কথায় এই দুইয়ের মাঝে সবুজের বিশাল আচ্ছাদন। সবুজ পাহাড়টিলা আর নয়নাভিরাম চা বাগানবেষ্টিত স্টেডিয়ামে কান পাতলেই শোনা যায় ব্যাট-বলের ঠুকঠাক শব্দ সাথে শীতের সকালের মিষ্টি রোদ ও বিকেলের ঠান্ডা হাওয়া, সব মিলিয়ে যেকোনো ক্রিকেটপ্রেমির জন্য এ যেন নৈঃস্বর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বাতাবরণ!
স্টেডিয়ামের মূল ভবনের প্রবেশ পথে যেতে অবশ্যই আপনার চোখ আটকে যাবে। শফিকুল হক হীরা, হাসিবুল হোসেন শান্ত, অলক কাপালি, রাজিন সালেহদের প্রজন্ম থেকে তরুণ আবু জায়েদ রাহি, সৈয়দ খালেদ ও ইবাদত হোসেনরাও জাতীয় দলের গর্বিত সিলেটি হিসেবে আলোকিত করেছেন গোটা স্টেডিয়ামকে। আলোকিত করেছেন এখানকার বিশাল সংগ্রহশালাকে। এমন কিছু এখানে যার নজির নেই দেশের আর কোন স্টেডিয়ামে।
কি নেই এখানে? স্মরণীয় সব মুহূর্ত ফ্রেমে বন্দি হয়ে আছে দেয়াল জুড়ে। বাংলাদেশের অভিষেক টেস্ট, টাইগারদের জয়ের স্মরণীয় বেশ কিছু মুহূর্ত, ক্রিকেটারদের অভিব্যক্তিগুলোও স্মৃতি স্মারক হিসেবে ঠাঁই পেয়েছে ছোট্ট এক অবয়বে। তারই একপাশে রাখা আছে এই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হওয়া অভিষেক টেস্টের ঐতিহাসিক ঘন্টা বা বেল।
মাত্র তিনটে দিনে মোট ৬টি ম্যাচের বিনোদন দিতে বিপিএল এসেছিলো সিলেটে৷ সময়টা অল্প হলেও কি ছিলো না এখানে? প্রচন্ড কুয়াশা থেকে শুরু করে মুসলধারে বৃষ্টি!! প্রকৃতি যেন আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলো বিপিএলের সাতটা দলকে বরণ করে নিতে। আমেরিকা থেকে আমদানিকৃত ঘাসে খেলেছেন মাশরাফি-তামিম থেকে শুরু করে কিংবদন্তি শোয়েব মালিকেরা। মাঝে কিছুদিন সংস্কার কাজের জন্য খেলার বাইরে থাকলেও বিপিএল দিয়েই ক্রিকেট ফিরেছে সিলেটে।

Exif_JPEG_420
স্টেডিয়ামের ভেতরে অবস্থিত “গ্রীন গ্যালারি” তে সবুজাভ ভাবটা ছিলো না এবার। আগের ঘাস তুলে নতুন করে গ্যালারিতে ঘাসের বীজ বপন করা হয়েছে। যার ফলে নতুন ঘাসগুলো রয়ে গেছে বেশ ছোট্ট ছোট্ট। দূর থেকে সবুজাভ ভাবটা লক্ষ্য করা যায় না। তবে আশার কথা হলো আগের তুলনায় এই গ্যালারি হয়েছে আরো বড়। এই আসরে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দর্শক সমাগম ছিলো অনেক কম। প্রথমবার যখন বিপিএল এসেছিলো চায়ের নগরীতে স্টেডিয়াম ছিলো কানায় কানায় পূর্ণ৷ স্বাগতিক সিলেট থান্ডারের ছন্দ একদমই না থাকায় রাগে-অভিমানে ক্রিকেটপ্রেমিরা নিজেদেরকে কিছুটা দূরে সরিয়ে রেখেছেন। থান্ডারের বেহাল দশাই প্রভাব ফেলেছে টিকেট কাউন্টারগুলোতে। তবুও শেষের দিন আগের দু’দিনের তুলনায় দর্শক সমাগম কিছুটা বাড়তি ছিলো। এত কিছুর পরেও গ্যালারি থেকে “সিলেট সিলেট” চিৎকার প্রেসবক্সে এসে পৌঁছেছে উঁচু গ্লাস ভেদ করে।
অত্যাধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ফ্লাডলাইন সুবিধা, আন্তর্জাতিক মানের ড্রেসিংরুম, নৈঃস্বর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বাতাবরণ তবুও কেন পর্যাপ্ত ম্যাচ পায় না সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম এই প্রশ্নটা থেকেই যায়৷ একটি বড় ম্যাচকে ঘিরে পুরো শহর জুড়ে সৃষ্টি হয় এক উৎসবমুখর পরিবেশের। স্টেডিয়াম গেট থেকে ক্রিকেটারদের হোটেল পর্যন্ত ভক্তদের সমাগম প্রমাণ করে সিলেটের মানুষেরা ঠিক কতটা ক্রিকেটপ্রেমি। মাশরাফি, মুশফিক কিংবা ফ্রাইলিঙ্ক, রাইলি রুশো, আন্দ্রে রাসেল সবাই এই স্টেডিয়ামটাকে নিয়ে, এই শহরটাকে নিয়ে, এই শহরের মানুষদের নিয়ে ভালোলাগার কথা শুনিয়েছেন।
