বীর গাঁথা, এক ওয়ার্নের কথা

নিউজ ক্রিকেট ২৪ ডেস্ক »

শেন ওয়ার্ন, ১৯৬৯ সালের ১৩ই সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়ার ফার্নট্রি গুল্লি এলাকায় জন্মগ্রহণকারী একজন জাদুকরের নাম। যার ঘূর্ণি জাদুর কথা সবারই জানা। শতাব্দীর সেরা ডেলিভারিটি যে দেখেনি তার দূর্ভাগ্যই বটে।

১৯৯৩ সালের অ্যাশেজ সিরিজে নিজের প্রথম ডেলিভারিটিই ছিলো এই শতাব্দীর সেরা ডেলিভারি। স্ট্রাইক প্রান্তে তখনকার স্পিনের বিরুদ্ধে অন্যতম সেরা ব্যাসম্যান মাইক গ্যাটিং। অধিনায়ক অ্যালান বোর্ডার বল তুলে দেন শেন ওয়ার্ন এর হাতে। বলটি লেগ স্টাম্পের বাইরে পিচ করে। তখন একজন ব্যাটসম্যান হামেশাই এটা ছেড়ে দেওয়ার চিন্তাই করেন। গ্যাটিংও সেই চিন্তাই করেছিলেন। কিন্তু বলটি লেগ স্টাম্পের বাইরো পিচ করে অফ স্টাম্পের উপরের অংশে আঘাত হানে৷ অস্ট্রেলিয়ান সবাই যখন উদযাপন করছেন ঠিক তখন গ্যাটিং পিচের দিকে তাকিয়ে আছেন নিখুঁত দৃষ্টিতে। হয়তো সে নিজে কল্পনাতেও ভাবেননি এতোটা নিখুঁত টার্ন করাবে এই আনকোরা বোলার।

তবে ক্যারিয়ারের শুরুটা ওয়ার্ন ভুলে যেতেই চাইবেন। এই জাদুকরের অভিষেকটা ছিলো একেবারে সাদামাটা। অভিষেক টেস্টে ১৫০ রানের বিনিময়ে নিয়েছিলেন মাত্র একটি উইকেট। দ্বিতীয় ম্যাচে উইকেটশূন্য ওয়ার্ন। তাই বাদ পড়েছেন পরের সিরিজেই৷ সেই বছরের আগস্ট মাসে শ্রীলঙ্কা সফরে আবারও দলে অন্তর্ভুক্তি ওয়ার্নের। প্রথম ইনিংসে যথারীতি ফ্লপ। ১০৭ রান দিয়ে উইকেট শূন্য। ওয়ার্নের ব্যার্থতার ঝুলি অনেকটাই পূর্ন তখন। গড় হয়েছে ৩৩৫!

দ্বিতীয় ইনিংসে ১৮১ রানের লক্ষে ব্যাট করতে নেমেই ৭ উইকেটে ১৫০ রান করে ফেলেন। এর পরে শেন ওয়ার্ন এর ঘূর্ণিতে ১১ রানেই ৩ উইকেট হারায় শ্রীলঙ্কা। ম্যাচ শেষে দুঃখ করে লংকান অধিনায়ক বলেছিলেন, “৩০০ গড়ের বোলিং এর কাছে আমরা হেরে গেলাম৷ তবে ঐ সিরিজের পর পুনরায় যায়গা হারান ওয়ার্ন৷ তবুও দমে না গিয়ে আস্থা অর্জন করেন নির্বাচকদের। সুযোগ আসে উইন্ডিজের বিরুদ্ধে। বক্সিং ডে ম্যাচে। বড় মঞ্চে বড় ভেলকি। প্রথম ইনিংসে ১ উইকেট নিলেও দ্বিতীয় ইনিংসে ৭ উইকেট নিয়ে ম্যাচ সেরা ওয়ার্ন।

১৯৯৩ সালেই আগমনী বার্তাটা ভালোভাবেই জানান শেন ওয়ার্ন। ঐ বছরের সর্বোচ্চ ৭২ উইকেট শিকার করে শেন ওয়ার্ন। সেখানেই শুরু। শেষ ২০০৭ সালে৷ মাঝের গল্পটা শুধুই বীরগাথা। ক্যারিয়ারের শেষে নামের পাশে ৭০৮ উইকেট। যা এখনও টেস্ট ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট।

যে মাঠে শুরু সেই মাঠেই শেষ ওয়ার্নের টেস্ট ক্যারিয়ার। ১৯৯২ সালে ভারতের বিপক্ষে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে শুরু, একই মাঠে শেষ ইংলিশদের বিরুদ্ধে৷

ক্যারিয়ারে অন্যদের তুলনায় খুব কম একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন শেন ওয়ার্ন। ১৯৪ ম্যাচের ওডিআই ক্যারিয়ারে ঝুলিতে পুরেছেন ২৯৩ উইকেট। নিজের খেলা দুটি বিশ্বকাপেই উজ্জল ছিলেন ওয়ার্ন। ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে নিয়েছিলেন ১২ উইকেট। তার ভিতরে সেমিফাইনালে ৪ উইকেট শিকার করে অস্ট্রেলিয়াকে ফাইনালে নিয়ে যান ওয়ার্ন। তবে ফাইনালে নিষ্প্রভ ওয়ার্ন, নিষ্প্রভ অস্ট্রেলিয়া। সেবার শিরোপা ছিনিয়ে নেয় শ্রীলঙ্কা।

১৯৯৯ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল এবং ফাইনালে ৪ উইকেট শিকার করে দলকে শিরোপা জেতান ওয়ার্ন। হতে পারতেন ২০০৩ সালের বিশ্বকাপ জয়ী সদস্যও তবে ক্যারিয়ার যতটাই উজ্জল ছিলেন ততটাই বিতর্কিত ছিলেন ব্যাক্তিগত জীবনে। ধুমপান অবস্থায় ছবি তোলায় দর্শককে মারধর, ১৯৯৯ বিশ্বকাপের আগে লংকান অধিনায়ককে নিয়ে মন্তব্য করায় দুই ম্যাচে নিষিদ্ধও হয়েছিলেন শেন ওয়ার্ন। তবে এবারের অপরাধটা ছিলো ড্রাগস গ্রহন করা। আর তাতেই শেষ হয়ে যায় ওয়ার্নের বিশ্বকাপ যাত্রা।

ক্রিকেটের দীর্ঘ যাত্রায় অনেক কিছু দিয়েছেন ক্রিকেটকে। ক্রিকেটও দিয়েছে তাকে দুহাত ভরেই দিয়েছেন। টেস্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি তিনি।

শেন ওয়ার্ন এর ক্যারিয়ার
টেস্টঃ ব্যাটিং- ম্যাচঃ ১৪৫, ইনিংসঃ ১৯৯, রানঃ ৩১৫৪, বলঃ ৫৪৭০, সর্বোচ্চঃ ৯৯, গড়ঃ ১৭.৩৩, স্ট্রাইক রেটঃ ৫৭.৬৬ অপরাজিতঃ ১৭, চারঃ ৩৫৩, ছক্কাঃ ৩৭, শূন্য রানঃ ৩৫, ফিফটিঃ ১২, সেঞ্চুরিঃ নেই।

বোলিং- ম্যাচঃ ১৪৫, ইনিংসঃ ২৭৩, রানঃ ১৭৯৯৫ বলঃ ৪০৭০৫, মেডেন ওভারঃ ১৭৬১, উইকেটঃ ৭০৮, গড়ঃ ২৫.৪২, ইকোনমিঃ ২.৬৫, স্ট্রাইক রেটঃ ৫৭.৪৯, ইনিংস বেস্টঃ ৮/৭১, ম্যাচ বেস্টঃ ১২/১২৮ ৫ উইকেটঃ ৩৭, ১০উইকেটঃ ১০।

ওডিআইঃ ব্যাটিং- ম্যাচঃ ১৯৪, ইনিংসঃ ১০৭, রানঃ ১০১৮, বলঃ ১৪১৩, সর্বোচ্চঃ ৫৫, গড়ঃ ১৩.০৫, স্ট্রাইক রেটঃ ৭২.০৫, অপরাজিতঃ২৯, চারঃ ৬০, ছক্কাঃ ১৩, শূন্য রানঃ ০। ফিফটিঃ ১, সেঞ্চুরিঃ নেই।

বোলিং- ম্যাচঃ ১৯৪, ইনিংসঃ ১৯১, রানঃ ৭৫৪১, বলঃ ১০৬৪২, মেডেন ওভারঃ ১১০, উইকেটঃ ২৯২,গড়ঃ ২৫.৭৪, ইকোনমিঃ ৪.২৫ স্ট্রাইক রেটঃ ৩৬.৩২, বেস্টঃ ৫/৩৩, ৫ উইকেটঃ ১, ৪ উইকেটঃ ১২।

বিভিন্ন দলের বিপক্ষে উইকেটঃ টেস্টঃ- ভারতঃ- ১০ ম্যাচে ৪৩ উইকেট। পাকিস্তানঃ- ১৫ ম্যাচে ৯০ উইকেট। শ্রীলঙ্কাঃ- ১৩ ম্যাচে ৫৯ উইকেট। বাংলাদেশঃ- ২ ম্যাচে ১১ উইকেট। ইংল্যান্ডঃ- ৩৬ ম্যাচে ১৯৫ উইকেট। উইন্ডিজঃ- ২৯ ম্যাচে ৬৫ উইকেট। সাউথ আফ্রিকাঃ- ২৪ ম্যাচে ১৩০ উইকেট। নিউজিল্যান্ডঃ- ২০ ম্যাচে ১০৩ উইকেট। জিম্বাবুয়েঃ- ১ ম্যাচে ৬ উইকেট। বিশ্ব একাদশঃ- ১ ম্যাচে ৬ উইকেট।

ওডিআইঃ- ভারতঃ- ১৮ ম্যাচে ১৫ উইকেট। পাকিস্তানঃ- ২২ ম্যাচে ৩৭ উইকেট। শ্রীলঙ্কাঃ- ১৮ ম্যাচে ২৯ উইকেট। বাংলাদেশঃ- ২ ম্যাচে ২ উইকেট। ইংল্যান্ডঃ- ১৮ ম্যাচে ২২ উইকেট। উইন্ডিজঃ- ২৭ ম্যাচে ৫০ উইকেট। সাউথ আফ্রিকাঃ- ৪৫ ম্যাচে ৬০ উইকেট। নিউজিল্যান্ডঃ- ২৭ ম্যাচে ৪৯ উইকেট। জিম্বাবুয়েঃ- ১২ ম্যাচে ২১ উইকেট। বিশ্ব একাদশঃ- ১ ম্যাচে ২ উইকেট। অন্যন্যঃ- ৩ ম্যাচে ৫ উইকেট।

নিউজটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »