বাইশ গজের এক ক্রিকেট দেবতার গল্পকথা

নিউজ ক্রিকেট ২৪ ডেস্ক »

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সাম্যবাদী কবিতায় বলেছিলেন,
       বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
      অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
ক্রিকেটীয় জীবন গল্প নিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম যদি কখনো কবিতা,লিখতেন তাহলে হয়তো কবিতাটি এমনই হতো।
     বিশ্ব ক্রিকেটে রয়েছে যত ক্রিকেটের রেকর্ড 
     অর্ধেক তাঁর করিয়াছে শচীন,বাকি অর্ধেক অন্যের। 
শচীন রমেশ টেন্ডুলকার এই নামটা  যেন বিশ্ব ক্রিকেটের এক ক্রিকেট দেবতার নাম। বিশ্বক্রিকেট হয়তো একটা সময় এসে কোন ক্রান্তিকালে থেমে যাবে তখন হয়তো সেদিন এই ব্যাট,প্যাড,বল সবই নিমজ্জিত হয়ে যাবে কোন মেঘযুক্ত আকাশের কালো ছায়ায় সেদিন ও সেই কালো মেঘযুক্ত আকাশে রাতের তারার মত করে ভেসে উঠবে একজন শচীন রমেশ টেন্ডুলকারের নাম। বাইশ গজে হাজারও স্মৃতি, ক্রিকেটীয় ছোট গল্প,উপন্যাসের রচিয়তা একজন শচীন রমেশ টেন্ডুলকার।  তিনি নিজেকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে গেছেন যেটা কি না এভারেস্টের থেকেও হাজার হাজার,মিলিয়ন মিলিয়ন, বিলিয়ন কিংবা ট্রিলিয়ন মাইল থেকেও উপরে। যতদিন ব্যাট,বল,প্যাডের সাথে ছিলেন ততদিন তিনি ক্রিকেটের বাইশ গজের রাজ্যটাকে শাসন নিজের মত করে একেঁছেন ব্যাটের আল্পনায় কত না ক্রিকেট চিত্র।  রেকর্ড গড়া কিংবা অন্যের রেকর্ড ভাঙ্গা যেন তাঁর প্রাত্যহিক রুটিন হিসেবে পরিলক্ষিত হচ্ছিলো বাইজ গজে। শচীনকে চিনে না কিংবা জানে না এমন মানুষ ক্রিকেটের মহারথে খুঁজলেও হয়তো সন্ধান মিলবে না। অসংখ্য ক্রিকেটারের কাছে শচীন একজন আইডল, একজন ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন লোক।
অনেক দেশে জাতীয় দলে খেলছেন এমন অসংখ্য ক্রিকেটার শচীনকে গুরু মানেন মানবেনই না কেন?  কি ছিলো না শচীনের মাঝে তাঁর ব্যাটেই যেন ফুটে উঠতো বাইজগজের শৈল্পিক কারুকার্য।
শচীনের জন্ম ও শৈশবকাল: 
এই ক্রিকেট মহারাজের জন্ম হয় ১৯৭৩ সালের ২৪ শে এপ্রিল নির্মল নামের একটি নার্সিং হোমে।  তাঁর বাবার নাম ছিলো রমেশ টেন্ডুলকার  ও তাঁর মাতা রজনী টেন্ডুলকার।  তাঁর বাবা পেশায় ছিলেন একজন মারাঠি উপন্যাসিক ও মাতা ছিলেন  একটি বীমা কোম্পানীর চাকুরীজীবি। তাঁর শচীনের নামের পিছনে রয়েছে এক ছোট গল্প।  ভারতের সে সময়কার বিখ্যাত সুরকার শচীন দেববর্মণের নাম অনুসারে শচীনের নাম রাখা হয় শচীন আর রমেশ টেন্ডুলকার হলো তাঁর বাবার নাম।  শচীন দেববর্মণ ও তাঁর পিতা রমেশ টেন্ডুলকার এইজনের নামের সংমিশ্রণে শচীনের নাম রাখা হয় শচীন রমেশ টেন্ডুলকার । শচীন ছাড়াও শচীনের ছিলো আরও দুই দাদা ও একজন দিদি।
তাঁর দাদারা হলেন নিতিন ও অজিত আর দিদি সবিতা।  তাঁর সবিতা ছিলো তাঁর বাবা রমেশের প্রথম স্ত্রীর সন্তান।
ক্রিকেটের হাতেখড়ি:
ছোটবেলায় শচীনের প্রিয় খেলা ছিলো টেনিস । তিনি প্রতিনিয়ত টেনিস খেলার অনুশীলন করতেন আর একজন টেনিস তারকা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।  সে সময়কার টেনিস তারকা জন ম্যাকেনরোকে কে আদর্শ মানতেন এই ব্লাষ্টার মাষ্টার। পরে একদিন তাঁর দাদা তাকে টেনিস ছেড়ে ক্রিকেটের রাজ্যে নিয়ে যান। এর আগে তাঁর বাবা মাত্র ১১ বছর বয়সে তাকে বলেছিলেন, ‘যাও, স্বপ্নটাকে তাড়া কর। তবে একটা জিনিস মনে রেখ, সাফল্যের কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নেই।’
তাঁর ক্রিকেট জীবনের প্রথম গুরু ছিলেন রমাকান্ত আচরেকর।  সেই সময়ে ভারতীয়দের মাঝে বিখ্যাত ছিলেন রমাকান্ত আচরেকর।  রমাকান্ত আচরেকর থাকতেন দাদরের শিবাজী অঞ্চলে।  ১৯৮৪ সালে শচীনের দাদা শচীনকে নিয়ে যান এই বিখ্যাত কোচের কাছে।  তাঁর তিনি তাকে পরামর্শ দেন দাদরের শারদাশ্রম বিদ্যামন্দির উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করান।  সেই বিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় শচীনকে ক্রিকেটের তালিম দিতেন রমাকান্ত । আস্তে আস্তে শুরু হলো প্রাত্যহিক অনুশীলন টেনিস ছেড়ে শুরু হলো নতুন এক পথে ছুঁটে চলা নতুন এক পথে পা ফেলা। গুরু রমাকান্ত যেন তাকে একটু আলাদা করেই তৈরী করছিলেন শচীনকে যারা ফলাফল পাওয়া যাচ্ছিলো সে সময়কার বিদ্যালয় ভিত্তিক ক্রিকেট টুর্নামেন্টে।  তাঁর সময়ে অনুষ্ঠিত বিদ্যালয় ভিত্তিক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট মাতুঙ্গা গুজরাটী সেবা মন্ডল শীল্ডে তাঁর বিদ্যালয় জয় লাভ করে আর যেখানে অসামান্য অবদান রাখেন।
সেখান থেকেই শুরু হলো টুর্নামেন্ট ভিত্তিক খেলার পথচলা।
তাঁরপরই সুযোগ পেয়ে গেলেন বোম্বাইয়ের কঙ্গ লীগ প্রতিযোগীতায়। প্রথমে তিনি খেলেন জন ব্রাইট  ক্রিকেট ক্লাবের অধীনে আর তার পরে তিনি খেলেন ক্রিকেট ক্লাব অফ ইন্ডিয়ার হয়ে।
১৯৮৭ সালে এমআরএফ পেস ফাউন্ডেশনে পেস বোলিংয়ের প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য পাড়ি জমান মাদ্রাজে আর সেখানে গিয়ে দেখা হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলার ডেনিস লেলির সাথে। ডেনিস লিলি তাকে পর্যবেক্ষণ করে তাকে ব্যাটিংয়ের প্রতি মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁরপর থেকে নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকেন একজন ব্যাটসম্যান হিসেবে।  ১৯৮৭ সালের ২০ শে জানুয়ারী ক্রিকেট ক্লাব ইন্ডিয়ার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বলবয় হিসেবে নামার সুযোগ হয়। এভাবেই এগিয়ে যেতে থাকে তাঁর ক্রিকেটের পথচলা।
ঘরোয়া ক্রিকেটের পথচলা:
একজন ক্রিকেটার হওয়ার জন্য জীবনের প্রথম ধাপটাই হলো ঘরোয়া ক্রিকেট যেকানের কোন ক্রিকেটারের পারফরম্যান্স বিবেচনা করেন বোর্ড কর্তারা।  ঘরোয়া ক্রিকেটে একজন ক্রিকোটার কতটা ভালো খেলছে তাঁর উপর নির্ভর করে তাঁর জাতীয় দলে অভিষেক হওয়ার সম্ভাবনা।  তবে শচীন যেন ঘরোয়া ক্রিকেটাটকে নিজের মত করে সাজিয়েছিলেন যার প্রথম দেখা মিলে অভিষেক ম্যাচেই।  ১৯৮৭ সালে ১৪ ই নভেম্বর রঞ্জি ট্রফিতে নিয়মিত খেলা মুম্বাই ক্রিকেট দলের হয়ে মাঠ মাতানোর সুযোগ পান।  তবে একাদশে জায়গা পেতে কষ্ট করতে হয়েছে তাকে শুটলরু দিকে কোন ভাবেই জায়গা হচ্ছিলো না শচীন টেন্ডুলকারের।  ১৯৮৭ সালের দিকে ভারত সফরে আসে নিউজিল্যান্ড সেই সময় নেটে প্র্যাকটিস করা অবস্থায় সেই সময়ের ভারতীয় দলের অধিনায়ক কপিল দেবের বলে ব্যাট করতেছিলেন শচীন।  কপিল দেবকে খুব সহজ ভাবেই খেলছিলেন শচীন চোখে পড়ে যায় মুম্বাই ক্রিকেট দলের অধিনায়ক দিলীপ বেঙ্গ সরকারের আর পরের ম্যাচেই সুযোগ দেন একাদশে।  অভিষেকই বাজিমাত শচীনের সুযোগ পেয়েই যেন নিজের সব টুকু বিলিয়ে দিলেন।  অভিষেক ম্যাচেই গুজরাট ক্রিকেট দলের বিপক্ষে অপরাজিত ১০০ রান করেন মাত্র ১৫ বছর ২৩২ দিন বয়সে যা কি না ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সে অভিষেক ম্যাচে শতক করার রেকর্ড। তাঁরপর থেকেই শুরু হলো শচীনের ব্যাটের কারিশমা।  তার কিছুদিন পরেই শতক করে বসেন দেওধর ট্রফি ও দিলীপ ট্রফিতে।
প্রতিনিয়ত শতক আসতে থাকলেও দ্বি- শতক পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ ১১ বছর৷ ১৯৯৮ সালে ভারত সফরে আসা অস্ট্রেলিয়া জাতীয় দলের বিপক্ষে খেলেন ২০৪* রানের জাদুকরী ইনিংস যা কি না তাঁর প্রথম দ্বি-শতক।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পদার্পণ: 
ঘরোয়াটা ক্রিকেটে নিয়মিত পারফর্ম করার ফল ও খুব তাড়াতাড়ি পেয়ে গিয়েছিলেন শচীন টেন্ডুলকার।  ঘরোয়া ক্রিকেটে যে বার তাঁর অভিষেক হয় সেবার তিনি ছিলেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক।  এত তাড়াতাড়ি জাতীয় দলে অভিষেক হবে এমনটা মনে হয় নিজেও কল্পনা করতে পারেনি। ঘরোয়া ক্রিকেটে এক মৌসুম দাপিয়ে পারফরম্যান্স করেই গায়ে তোলেন জাতীয় দলের জার্সি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের শুরুটা হয় ক্রিকেটের অভিজাত ফরম্যাট টেষ্ট দিয়ে।  ১৯৮৯ সালের নভেম্বর মাসে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মাত্র ১৬ বছর ২২৩ দিন বয়সে অভিষেক হয়,টেষ্টে।  তবে অভিষেক টেষ্টে নিজেকে সেভাবে মেলে ধরতে পারেনি মাত্র ১৫ রান করে ওয়াকার ইউনুসের বলে বোল্ড হয়ে ফিরে যান প্যাভিলিয়নে। টেষ্ট ক্রিকেটে প্রথম শতকের দেখা পান ১৯৯০ সালে ইংল্যান্ডের র বিরুদ্ধে ২য় টেষ্ট খেলার সময়।
তাঁর কিছুদিন পর নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে অভিষেক হলেও ফিরে যান শূন্য রান করে তাঁর পরের ম্যাচে অবশ্য করেছিলেন ৩৬ রান। এরপর অনেকটা সময় বাহিরে থাকতে হয় একদিনের ক্রিকেট থেকে।  ১৯৯৪ সালে আবারও ওয়ানডে দলে জায়গা করে নেন শচীন সে ম্যাচে অকল্যান্ডে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওপেন করতে নেমে করেন ৪৯ বলে ৮২ রান।  ওয়ানডে ক্রিকেটে তাঁর বয়াট থেকে প্রথম শতক আসে একই বছর ৯ ই সেপ্টেম্বর  শ্রীলংকাতে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে । টি-২০ খেলাটাকে তিনি খুব একটা বেশি পছন্দ করতেন না তাই খেলেছেন একটি মাত্র ম্যাচ। ২০০৬ সালে দক্ষিন আফ্রিকার সাথে সেই ম্যাচে করেছিলেন মাত্র ১০ রান।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যত রান:
 বিশ্বক্রিকেটের এক মহানায়কের নাম শচীন রমেশ টেন্ডুলকার যার আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানই তাকে পরিচয়,করে দেয়। ২৪ বছরের ক্যারিয়ারে দেখতে হয়েছে অনেক চড়াই উতরাই,শুনতে হয়েছে হাজারও কথা।  ২৪ বছরেরর ক্যারিয়ারে তার আন্তর্জাতিক রান সংখ্যা প্রায় ৩৪ হাজার। ক্রিকেট ক্যারিয়ারে খেলেছেন ২০০ টেষ্ট, ৪৬৩ ওয়ানডে ও একটি মাত্র টি-২০।
১৯৮৯ সালের ১৮ ই ডিসেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ওয়ানডে অভিষেক হয় মাষ্টার ব্লাষ্টারের। ৪৬৩ ওয়ানডেতে ৪৫২ ইনিংসে ব্যাট করে ৪৪.৬৩ গড়ে করেছেন ১৮,৪২৬ রান যার মাঝে চারের মার ছিলো ২০১৬ টি আর ছয়ের মার ছিলো ১৯৫ টি। ৪৬৩ ইনিংসে বল মোকাবেলা করেছেন ২১৩৬৭ টি আর নট আউট ছিলেন ৪১ টি ম্যাচে।  পুরো ওয়ানডে ক্যারিয়ারে রয়েছে ৪৯ টি সেঞ্চুরি,৯৬ টি ফিফটি আর ডাবল সেঞ্চুরি ছিলো একটি যা কি না তাঁর ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রানের স্কোর । একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিনিই প্রথম ২০০* রান করেন।
তাঁর ক্রিকেট ক্যারিয়ারে খেলেছেন ২০০ টি টেষ্ট ম্যাচ যেখানে তিনি ৩২৯ ইনিংসে ব্যাট করে ৫৩.৭৮ গড়ে করেছেন ১৫৯২১ রান।  টেষ্টে করেছেন ৫১ টি শতক ও ৬৮ টি অর্ধশতক।
২০০৬ সালে দক্ষিন আফ্রিকার বিরুদ্ধে খেলেছিলেন একটি মাত্র টি-২০ যেখানে তিনি এক ম্যাচে করেছিলেন মাত্র ১০ রান।  এক ম্যাচ খেলার পর তিনি ঘোষণা দেন তিনি আর টি-২০ খেলবেন না।
শচীনের যত শতক :
শচীন রমেশ টেন্ডুলকার নামটি হাজারও বছর গেঁথে থাকবে কোটি কোটি ক্রিকেট প্রেমীর হৃদয়ে।  শচীন এমন একজন ক্রিকেটার যার কি না জন্ম হয়েছিল শুধু হয়তো রেকর্ড গড়ার জন্য।  শতক নিয়ে তাঁর এমন এক কীর্তি যা কি না ক্রিকেট বিশ্বে বিরল করেছেন ওয়ানডে ও টেষ্ট মিলিয়ে ১০০ টি শতক যা কি না ক্রিকেট বিশ্বে প্রথম ও একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে।
আমরা আজ ছুটে চলবো তাঁর শতকের গল্পের পিছনে।
১৯৮৯ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে শুরু হয় তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।  ১ম সিরিজে খুব একটা বেশি সুবিধা করতে পারেননি তিনি।  আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে প্রথম শতকের দেখা পেতে খুব একটা বেশি সময় নেয়নি।  ১৯৯০ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২য় টেষ্টেই করে বসেন ক্যারিয়ারের প্রথম শতক।  ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২য় টেষ্টে খেলেন অপরাজিত ১১৯ রানের ইনিংস যা কি না ইতিহাসের ২য় কনিষ্ঠতম ক্রিকেটার হিসেবে কীর্তি গড়েন। তাঁরপর থেকেই শুরু শতকের গল্প গাঁথা।  দিন পেরিয়ে রাত,মাস, বছর যত যায় শতকের ছোট গল্প যেন আস্তে আস্তে উপন্যাসে রুপান্তরিত হতে থাকে।
দেখে নেয়া যাক কোন দেশের বিরুদ্ধে কতটি শতক হাঁকান:
১. অস্ট্রেলিয়া —- টেষ্টে ১১ টি ও ওয়ানডেতে ৯ টি
২. শ্রীলঙ্কা—— টেষ্টে ৯ টি ও ওয়ানডেতেতে ৮ টি
৩. দক্ষিন আফ্রিকা—- টেষ্টে ৭ টি ও ওয়ানডেতে ৫ টি
৪. ইংল্যান্ড —– টেষ্টে ৭ টি ও ওয়ানডেতে ২ টি
৫.নিউজিল্যান্ড —-  টেষ্টে ৪ টি ও ওয়ানডেতে ৫ টি
৬. ওয়েস্ট ইন্ডিজ —- টেষ্টে ৩ টি ও ওয়ানডেতে ৪ টি
৭. জিম্বাবুয়ে —– টেষ্টে ৩ টি ও ওয়ানডেতে ৫ টি
৮. পাকিস্তান —– টেষ্টে ২ টি ও ওয়ানডেতে ৫ টি
৯.বাংলাদেশ —- টেষ্টে ৫ টি ও  ওয়ানডেতে ১ টি
১০. কেনিয়া—- টেষ্টে ০ ও ওয়ানডেতে ৪ টি
১১.নামিবিয়া—– টেষ্টে ০ ও ওয়ানডেত ১ টি
ক্যারিয়ারে সর্বোমোট ৬৬৪ টি ম্যাচ খেলে করেছেন ১০০ টি শতক যা কি না শুধুই রেকর্ড আর রেকর্ড। একটা সময় এসে মনে হয়েছে শচীন মানেই যেন শতক আর শতক মানেই যেন শচীন। মুদ্রার উল্টা পিঠ দেখতে হয়েছে অনেক সময় না হলে হয়তো শতকের সংখ্যাটা আরও বেশি থাকতো।
বল হাতে শচীন: 
ব্যাট হাতে শচীন যতটা সফল বল হাতে ঠিক ততটা সফল নন শচীন।  পুরো ক্যারিয়ারে পেয়েছেন মাত্র ২ বার পেয়েছেন ৫ উইকেট করে যেখানে একটি ম্যাচে কোচিতে ৫ উইকেট নিয়ে ভারতের জয়ে অসামান্য অবদান রাখেন।  টেষ্ট ক্রিকেটে ২০০ ম্যাচের ১৪৫ ইনিংসে হাত ঘুরিয়েছেন যেখানে তিনি বল করেছেন ৪২৪০ টি আর ২৪৯২ রান দিয়ে পেয়েছেন ৪৬ টি উইকেট।  টেষ্ট ক্রিকেটে বেষ্ট বোলিং ফিগার এক ইনিংসে ১০ রানে ৩ উইকেট আর এক ম্যাচ অনুসারে ১৪ রানে ৩ উইকেট। টেষ্ট ক্যারিয়ারে কখনো ছুঁয়ে দেখা হয়নি ৫ উইকেট শিকারের। ওয়ানডেতে ৪৬৩ টি ম্যাচের ২৭০ টি ইনিংসে বল করেছেন ৮০৫৪ টি আর রান দিয়েছেন ৬৮৫০ টি। ৪৬৩ ম্যাচের ২৭০ টি ইনিংসে বল করে উইকেট পেয়েছেন মাত্র ১৫৪ টি। ক্যারিয়ারের সেরা বোলিং ফিগার ৩২ রানে ৫ উইকেট। ৪ বার ৪ উইকেট ও ২ বার ৫ উইকেট নেন। টি-২০ তে খেলেছিলেন একটি মাত্র ম্যাচ যেখানে তিনি বল করেন নি।
বাইশ গজের যত রেকর্ড :
শচীন টেন্ডুলকার বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় তাতে সন্দেহ থাকার কোন অবকাশ নেই।  ক্যারিয়ারের শুরু থেকে শেষ অবদি গড়েছেন অনেক রেকর্ড।
তাঁর ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য কিছু রেকর্ড :
টেস্টে
১. ক্রিকেট বিশ্বে সবচেয়ে বেশি চার মারা ক্রিকেটার তিনি যার সংখ্যা ২০৪৪ টি+
২. সবচেয়ে কম সময়ে করেছেন ৮ হাজার রান ( ১৫৪ ইনিংসে)
৩. সবচেয়ে কম সময়ে ব্রায়ান লারার সাথে করেছেন ১০ হাজার রান। (১৯৫ ইনিংস)
৪. ছুঁয়েছেন ১২ ও ১৩ হাজার রানের মাইলফলক।
৫. সবচেয়ে কম সময়ে ১৪ ও ১৫ হাজার রান সংগ্রহকারী।
৬. বিদেশের মাটিতে করেন ৮৭০৫ রান যা কি না বিদেশের মাটিতে সবচেয়ে বেশি।
৭. ২০ বছরে পা দেয়ার আগেই করেছেন ৫ শতক।
৮. ভারতীয় অধিনায়ক হিসেবে সর্বোচ্চ ২১৭ রানের ইনিংস খেলেন।
৯. স্টিভ ওয়াহ আর গ্যারি কারস্টেনের পর ৩য় খেলোয়াড় হিসেবে করেছেন সব টেষ্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে শতক।
১০. রাহুল দ্রাবিড়ের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি শতরানের পার্টশীপ করেন তিনি যার সংখ্যা ২০ টি।
ওয়ানডেতে
১. ওয়ানডেতে ৯৬ টি ফিফটি যা কি না সবচেয়ে বেশি
২. সবচেয়ে বেশি ৯০ রানের ঘরে গিয়ে আউট হয়েছেন।  (১৭ বার)
৩. ৩ বার আউট হয়েছেন ৯৯ রানে
৪. ওয়ানডেতে সবচেয়ে বেশি চারের মালিক তিনি যার সংখ্যা ২০১৬টি
৫. এক বছরে সবথেকে বেশি রান করেন (১৮৯৪ রান)।
৬.এক বছরে সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরি হাঁকান  (৯ টি )।
৭. কোন একটি নির্দিষ্ট দলের বিপক্ষে সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরি হাঁকান। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৯ টি
৮. ৬২ টি বার হয়েছেন ম্যাচ সেরা যা কি না সবচেয়ে বেশিবার।
৯.  ১৬ বার হয়েছেন সিরিজ-সেরা যা কি না রেকর্ড
১০.একটানা ১৮৫টি ম্যাচ খেলার রেকর্ড
১১. তিনিই একমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে ১৪, ১৫, ১৬, ১৭ এবং ১৮ হাজার রান পূর্ণ করেন
১২. বিশ্বকাপ সবচেয়ে বেশি রান সংগ্রাহক করছেন ৫৬.৯৫ গড়ে ২২৭৮ রান
১৩.বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশিবার অর্থাৎ ৮ বার হয়েছেন ম্যান অব দ্য ম্যাচ।
১৪. বিশ্বকাপে এক আসরে করেন ৬৭৩ রান
১৫.শচীন ও সৌরভ গাঙ্গুলীর জুটিতে এসেছে ৮২২৭ রান
১৬.সৌরভ গাঙ্গুলীর সঙ্গে ২৬টি শতকের পার্টনারশীপ করেন যা কি না রেকর্ড
১৭.অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে করেছেন ৩ হাজারের বেশি রান
১৮. অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে করেছেন ২৫০০ এর বেশি রান
সম্মাননা ও পুরষ্কার :
১. স্যার গারফিল্ড সোবার্স ট্রফি পান
২.  ২০১০ সালের এর সেরা ক্রিকেটার নির্বাচিত হন
৩.২০০৮ সালে ভারতের ২য় সর্বোচ্চ পুরষ্কার পদ্মবিভূষণে ভুষিত হন
৪. খেলাধুলায় ২০০৫ সালে রাজীব গান্ধী পুরষ্কার পান
৫. টুর্ণামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয় ২০০৩ সালের বিশ্বকাপে
৬.২০০১ সালে মহারাষ্ট্র সরকার  তাকে নাগরিক পুরষ্কার দেন।
৭. ১৯৯৯ সালে ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক পুরষ্কার পদ্মশ্রীতে ভুষিত হন
৮. উইজডেন বর্ষসেরা ক্রিকেটার: ১৯৯৭ সালের উইজডনের বর্ষসেরা ক্রিকেটার নির্বাচিত হন।
৯. ভারত সরকার খেলায় ভাল করায় অর্জুন পুরস্কার দেন
১০. ২০১৯ সালের জুলাইয়ে আইসিসির হল অব ফেমে শচীন জায়গা করে নেন যা কি না ভারতের ষষ্ঠ ক্রিকেটার হিসেবে।
১১. ২০১৪ সালে ভারতরত্ন পুরষ্কার পান
বাইজগজের শেষ দিন :
প্রতিটি জীবের যেমন আছে তেমনি তাঁর মৃত্যুও আছে এটা অবধারিত।  আপনি চাইলেই চিরন্তন বিষয় গুলো ভুল প্রমাণ করতে পারবেন না।  জন্মনিলে যেমন আপনাকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে তেমনি আপনার ক্যারিয়ার থাকলে একদিন এসে সেটারও ইতি টানতে হবে।  শচীন রমপশ টেন্ডুলকার নামটা কারোরই অজানা নয়।  তিনি হাজারও ক্রিকেট প্রেমীর অং সাং হিরো, জানা অজানা অসংখ্য ক্রিকটারের আইডল। ২৪ বছরে বাইজগজে লিখেছে হাজারও গল্প,কবিতা,উপন্যাস।  চিত্রশিল্পীর মত করে ব্যাট হাতে একেঁছেন কতশত আল্পনার চিত্রকর্ম। সময়টা ২০১৩ সালের ১৪ নভেম্বর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেষ্টের মাধ্যমে ইতি টানেন ২৪ বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের। ওয়ানডে থেকে অবসর নিয়েছিলেন অবশ্য আগেই ২০১২ সালের ১৮ ই ডিসেম্বর পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলেন সর্বশেষ ওয়ানডে। মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়েতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে যখন ১০১ তম শতকের দিকে হাটিঁ হাটিঁ পা করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তখনই যেন হলো ছন্দ পতন।  হঠাৎ  ই ডিও নারিনের বলে সামির হাতে ক্যাচ দিয়ে ৭৪ রানে ফিরে গেলেন বাইজগজের মায়া ছেড়ে।  তখন ভারতীয়দের মাঝে যেন আক্ষেপের শেষ ছিলো না শুধু মাত্র ভারতীয়দের কাছে নয় অসংখ্য ক্রিকেটপ্রেমী চেয়েছিলেন ক্রিকেটের ঈশ্বর জীবনের শেষ ম্যাচটায়  আরও একবার ব্যাটটা উঁচিয়ে ধরুক বিশ্ব ক্রিকেট দরবারে। ওয়াংখেড়েতে যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ১১ তম ব্যাটসম্যান শ্যানন গ্যাব্রিয়লের মিডেল স্ট্যাম্পটা সামি উড়িয়ে দিলেন তখন স্কিনবোর্ডে বড় করে লেখা ভেসে উঠলো ‘ গড নেভার রিটায়ার ‘। গ্যাব্রিয়লের সেই আউটের সাথে সাথেই শেষ হলো ৪০ বছরের একজন জাদুকরের ২৪ বছরের জাদুর গল্প।
  ক্রিকেট যদি ভারতীয়দের ধর্ম হয় তাহলে শচীন নিঃসন্দেহে সেই ক্রিকেট ধর্মের দেবতা। টিম ম্যাটরা জানালেন ‘ গার্ড অব অনার ‘ আর গ্যালারিতে চোখ পড়তেই ভেসে আসছিলো হাজারও বিচিত্র লেখার প্লেকার্ড।  কেউ লিখে এনেছিলেন গড নেভার রিটায়ার,আবার কেউ বা লিখে এনেছিলেন মিস ইউ লিজেন্ড।  আসলে যে ভাবেই প্রকাশ করুক না কেন তাকে প্রকাশ করার জন্য ব্যাকরণের ভাষাও অম্লীন।
কিংবদন্তিরা কখনো বিদায় নেয় না তারা জীবিত থাকে হাজারও মানুষের অন্তরে শচীন টেন্ডুলকার ও তেমনই একজন।বেঁচে থাকবেন ক্রিকেটের বাইজগজে যুগ থেকে যুগান্তরে।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
নিউজটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন »

মন্তব্যসমূহ »

মন্তব্য করুন »