বাংলাদেশ ক্রিকেটের ফিরে দেখা ২০১৯

মমিনুল ইসলাম »

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দেখতে দেখতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে ২০১৯ সাল। ক্রিকেট ক্যালেন্ডারের আরও একটি বছরের সমাপ্তি হতে যাচ্ছে। ক্রিকেটের এই ক্যালেন্ডার বর্ষে ঘটেছে নানাবিধ ঘটনা। বাংলাদেশের ক্রিকেটের ধুসর কালো বছরের আরও একটি বছর ২০১৯ যেখানে রয়েছে আফগানিস্তানের মত নতুন সদস্যপদ পাওয়া টেস্ট দলের সাথে হার, ক্রাইচচার্চের দুর্ঘটনা, বিশ্বকাপ হতাশা, শ্রীলঙ্কার সাথে হোয়াইট ওয়াশ, ক্রিকেটারদের আন্দোলন , সাকিবের নিষেধাজ্ঞা আর সবশেষ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশীপের অভিষেকে বাংলাদেশের অসহায় আত্মসমর্পণ।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের এবছরটা যতটা না সাফল্য পেয়েছে তার থেকে বেশি হতাশায় ভুগিয়েছে। এবছরে রোলারকোস্টারের মত উঠানামা করেছে বাংলাদেশের ক্রিকেট আর ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স। সবচেয়ে হতাশায় ভুগিয়েছে শুরু করেও ভালো শেষ করতে পারেনি তারা। বিশ্বকাপের মাধ্যমে নিজের ক্যারিয়ারের উত্থান হলেও অবনতি হয়েছে মাশরাফির পারফরম্যান্সে।

 

ক্রাইচচার্চের দুর্ঘটনা ও হতাশায় কিউই সফর:

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ বিপিএলের ষষ্ঠ আসর শেষে ফেব্রুয়ারি-মার্চে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ ও তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলতে নিউজিল্যান্ড সফরে যায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। তবে যতটা আশা নিয়ে কিউই সফরে যায় তার বিন্দুমাত্রও পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ দল। চোটের কারনে নিউজিল্যান্ড সফরে যাওয়া হয়নি বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের। তার প্রভাবটাও মিলেছে মাঠেী ক্রিকেটে। সাকিবের না থাকাটা বাংলাদেশকে ভুগিয়েছে পুরো সিরিজেই।

ওয়ানডে ম্যাচ দিয়ে শুরু হয় কিউদের সাথে সফর তবে সেখানে কিউদের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি বাংলাদেশ। ওয়ানডে ম্যাচের তিনটিতেই হেরে ওয়ানডে তে হোয়াইটওয়াশ হয় বাংলাদেশ। এর পর সাদা পোষাকেও সাফল্য মিলেনি টাইগারদের। সিরিজের প্রথম দুই টেস্টেই হেরে যায় বাংলাদেশ। শেষ টি-টোয়েন্টির আগেই ঘটে বিমর্ষ ঘটনা। জুম্মার নামাজ পড়ার জন্য আল নূর মসজিদে যাওয়ার কথা ছিলো তামিম,রিয়াদদের। তবে সেখানে একটু দেরি হয়ে যায় তাতেই কি না প্রাণে বেঁচে যায় টাইগাররা। মসজিদের পোঁছানোর আগেই মুখোশ ধারী এক লোক মসজিদে হামলা চালায় তাতে মারা যায় ৪৯ জন মুসলিম। আর যেকারনে বাতিল করা হয় শেষ ও তৃতীয় টেস্ট।

ত্রিদেশীয় সিরিজ হয় :

ক্রাইচচার্চের এই লৌহমর্ষ ঘটনার পর বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশ পাড়ি জমায় আয়ারল্যান্ডে। সেখানে বাংলাদেশ, আয়ারল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ মিলে শুরু হয় ত্রিদেশীয় সিরিজ। যেখানে দেখা মিলে এক অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশকে। টুর্নামেন্টে অপরাজিত থেকে প্রথম বারের মত ত্রিদেশীয় সিরিজ জিতে বাংলাদেশ। ফাইনালে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত আর সৌম্য সরকারের ব্যাটিং তান্ডবে ২২.৫ ওভারেই টপকায় ২১০ রানের টার্গেট।

হতাশার বিশ্বকাপ:

বিশ্বকাপের আগে প্রথম বারের মত ত্রিদেশীয় ট্রফি জিতে বাংলাদেশ। তাই তো নিজেদের আত্নবিশ্বাসটা ছিলো তুঙ্গে সেই সাথে দর্শকদের প্রত্যাশাও ছিলো এভারেস্টের চূড়ায়। তবে ত্রিদেশীয় সিরিজের মোমেন্টামটা ছিলো বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ অবদি। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই দক্ষিন আফ্রিকাকে হারিয়ে দারুণ শুরু করে বাংলাদেশ। তবে তা ধরে রাখতে পারেনি টাইগাররা। পরের ম্যাচ গুলোতে কেবল মাত্র আফগানিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ছাড়া আর কাউকে হারাতে পারেনি৷ দশ দলের বিশ্বকাপে আট নম্বরে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করে সাকিব-তামিমরা।

 

বিশ্বকাপে আলোকিত সাকিব :

বিশ্বকাপ যখন হতাশায় আছন্ন সেখানে নিজের ক্যারিয়ার সেরা ফর্মে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। বাংলাদেশি বোলার ও ব্যাটসম্যানরা যখন নিজেদের হারিয়ে খুঁজছে আর তখন সাকিব আল হাসান চলছেন তাদের বিপরীত পথে। বিশ্বকাপের টুর্নামেন্ট সেরার অন্যতম দাবিদার সাকিব আল হাসানের বয়াট থেকে আসে ৬০৬ রান ও বল হাতে ১১ উইকেট৷ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে এক বিশ্বকাপে ৫০০ রান ও ১০ উইকেট নেয়ার কৃতিত্ব দেখান সাকিব।

 

লঙ্কাদ্বীপে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ:

বিশ্বকাপের হতাশায় যখন নিমজ্জিত বাংলাদেশ তখনই লঙ্কাদ্বীপে সফরে যায় বাংলাদেশ । বিশ্বকাপে ব্যাটে বলে দারুন পারফর্ম করা সাকিবকে রেস্টে রেখে স্কোয়াড ঘোষণা করে বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কা সফরে যাওয়ার আগে ইনজুরিতে পড়ে নিয়মিত অধিনায়ক মাশরাফি বিন মোর্ত্তজা। পরে তামিম ইকবালকে অধিনায়ক করে দল পাঠায় বিসিবি। বিশ্বকাপের হতাশার গল্পটা আরও বড় হয় শ্রীলঙ্কা গিয়ে। তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের তিনটিতেই হেরে হোয়াইটওয়াশ হয় বাংলাদেশ।

আফগানিস্তানের সাথে টেস্ট হার :

ঘরের মাঠে যেকোন ফরম্যাটেই শক্তিশালী বাংলাদেশ। ঘরের মাঠে অস্ট্রোলিয়া ও ইংল্যান্ডের মত দলকে হারিয়েছে টেস্টে। বাংলাদেশের সাথে টেস্ট খেলতে আসার আগে কেবল মাত্র দুটি টেস্ট খেলেছিলো আফগানিস্তান। আফগানিস্তানের মত দলের সাথে স্পিন পিচ বানিয়ে হতাশায় ভুগে বাংলাদেশ। আফগানিস্তানের বোলারদের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি টাইগাররা। আর তাতেই আফগানিস্তানের মত সদয় টেস্ট স্ট্যাস্টাস পাওয়া দলের সাথে পরাজয় করে সাকিব বাহিনী।

 

ক্রিকেটারদের ধর্মঘট:

অনেকদিন ধরে ক্রিকেটারদের নিজেদের জমা রাখা মনের ক্ষোভ মিডিয়ার সামনে আনেন ক্রিকেটাররা। এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত অবস্থা। ক্রিকেটারদের ১১ দফা দাবি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসে ক্রিকেটাররা। তা নিয়ে পরেরদিন সংবাদ সম্মেলন করে বিসিবির কর্মকর্তারা। ক্রিকেটাররা ভারত সফর বাতিল ও সব ধরনের ক্রিকেট বর্জনের সিদ্ধান্ত নিলে তা গড়ায় প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত। অবশেষে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ক্রিকেটারদের দাবি দাওয়া মেনে নেয় ক্রিকেট বোর্ড। আর ক্রিকেটাররা ফিরে ক্রিকেটে।

 

সাকিবের নিষেধাজ্ঞা :

সাকিব আল হাসান বাংলাদেশ ক্রিকেটের পোস্টার বয়। সাকিব আল হাসান নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসের সেরা ক্রিকেটার। ব্যাটে বলে বাংলাদেশের অনেক জয়ের সাক্ষী বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার । বিশ্বকাপে ও সাকিব হাসান ব্যাট ছিলো দুর্দান্ত বল হাতেও কম যাননি সাকিব। তবে হঠাৎই সাকিবের ক্যারিয়ার ও বাংলাদেশের ক্রিকেটের আকাশে মেঘ জমে উঠে। ভারতের জুয়াড়ীর সাথে আলাপচারিতা গোপন রাখার অপরাধে সাকিবকে দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা দেয় আইসিসি। এক বছর মাঠের ক্রিকেটের নিষেধাজ্ঞা ও আরেক বছর মাঠের বাহিরের। তবে সাকিবের এমন নিষেধাজ্ঞায় কালো মেঘ ছেঁয়ে আসে বাংলাদেশ ক্রিকেটে।

 

ভারত সফর ও টি-টোয়েন্টি জয় :

ধর্মঘট, সাকিবের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে যখন টালমাটাল বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন তখনই ভারত সফরে যায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়া বাংলাদেশ দল। টি-টোয়েন্টি সিরিজ দিয়ে শুরগ হয় ভারত সফরে। সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টিতেই মুশফিকের ব্যাটে প্রথমবারের মত টি-টোয়েন্টিতে ভারতকে হারায় বাংলাদেশ। অবশ্য পরের দুই ম্যাচে জয়ের দেখা পায়নি বাংলাদেশ । তৃতীয় ময়াচে জয়ের খুব কাছে গিয়েও হারতে হয়েছে রিয়াদের দলকে। এরপর টেস্টে নাকাল অবস্থা হয় বাংলাদেশের। ভারতের মাটিতে টেস্ট চ্যাম্পিয়ানশীপের অভিষেক হয় টাইগারদের। তবে টেস্ট চ্যাম্পিয়ানশীপে ভারতের পেসারদের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি বাংলাদেশ। দুই ম্যাচেই ইনিংস ব্যবধানে পরাজয় বরণ করে বাংলাদেশ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
নিউজটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »