পরিবারের জন্যই এখনো খেলছি ক্রিকেট: সালাউদ্দিন পাপ্পু

নিউজ ক্রিকেট ২৪ ডেস্ক »

সালাউদ্দিন পাপ্পু! বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, ৪৩ বছর বয়সে এসেও দাপুটের সাথে বাইশ গজ মাতিয়ে বেড়ানো এক ক্রিকেট যোদ্ধা। এই বয়সে এখনো নিয়মিত খেলে যাচ্ছেন পেশাদার ক্রিকেট। সর্বশেষ, দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট টুর্নামেন্টে ৫০ এর অধিক গড়ে ১৫ ম্যাচে ৭৫২ রান করেছেন এই ক্রিকেটার। যেখানে ৩৫-৪০ বছরের এই সময়টায় ক্রিকেটাররা নিজেদের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের সমাপ্তিরেখা টানার পরিকল্পনা হাতে নেন, সেখানে সালাউদ্দিন পাপ্পু লিস্ট-এ ক্রিকেটে নিজের অভিষেক ঘটিয়েছেন ২০১৭ সালে ৩৮ বছর বয়সে। লিস্ট-এ ক্রিকেটে ইতিমধ্যে ৫ বছর কাটিয়ে ফেলেছেন, ৪৩ বছর বয়সে এসেও এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন ক্রিকেট। পরিবারের জন্য আরো অন্তত বছর দুয়েক চালিয়ে যেতে চান খেলা।

নিউজক্রিকেট টুয়েন্টিফোরকে দেওয়া একান্ত  সাক্ষাৎকারে “সালাউদ্দিন পাপ্পু” কথা বলেছেন নিজের ২৩ বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে।

 নিউজক্রিকেট: ৪৩-৪৪ বছরে এসেও দাপুটের সাথে পেশাদার ক্রিকেট খেলে যাচ্ছেন। বয়সটাকে কি কখনো প্রতিবান্ধক মনে হয় না? এত আত্মবিশ্বাস পান কোথা থেকে?

সালাউদ্দিন পাপ্পু: মাঝেমাঝে কেমন কেমন যেন মনে হয় নিজের কাছে। মন চায় ক্রিকেটটা ছেড়ে দেই। ভিতর থেকে কেন জানি সেই স্প্রিডটা আসে না। তারপর, আবার চিন্তা করি ক্রিকেটটা ছেড়ে দিলে করবো টা কি। আমার পরিবার আছে, পরিবারের জন্য হলেও ক্রিকেটটা চালিয়ে যেতে হয়। তখন আবার নিজেই আত্মবিশ্বাস নিয়ে প্রেকটিস করি। নিজের ইচ্ছা আকাঙ্খা গুলোকে একপাশে রেখে, মনের বিরুদ্ধে হলেও অনুশীলন করি, ম্যাচ খেলি। বয়সটা এখন ইদানীং ইচ্ছাশক্তির উপর প্রভাব ফেলছে। তবুও, ওই যে বললাম পরিবার। সংসারের কথা মাথায় রেখেই খেলতে হয় আর তাই খেলে যাচ্ছি। আত্মবিশ্বাসটা পরিবারের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতা থেকে চলে আসে।

নিউজক্রিকেট: খুব সম্ভবত ২০১৭ সালের দিকে ৩৮ বছর বয়সে এসে লিস্ট-এ ক্রিকেটে অভিষেক হয় আপনার। যে সময়টায়, একজন ক্রিকেটার ক্রিকেটকে বিদায় বলা নিয়ে ভাবেন, ওই সময়টায় আপনি লিস্ট-এ ক্যারিয়ার শুরু করলেন!!. এতো আত্মবিশ্বাস কিভাবে এলো? লিস্ট-এ ক্রিকেটে আপনার সেই অভিষেকের গল্পটা যদি সেয়ার করতেন।

সালাউদ্দিন পাপ্পু: আমার ভিতরে প্রিমিয়ার খেলার একটা জিদ ছিল। স্বপ্নও বলতে পারেন। আমি যখন থেকে ক্রিকেট খেলি, তখন থেকেই মাইন্ড সেটআপ করে রেখেছিলাম যেভাবে হোক যে সময় হোক, কোন একদিন প্রিমিয়ার আমি খেলবই।সেই লক্ষ্যেই ক্রিকেট চালিয়ে যাচ্ছিলাম ক্লান্তিহীন ভাবে। ২০১৬ সিজনে একটা ম্যাচে সূর্যতরুণকে হারিয়ে, আমরা খেলাঘর প্রিমিয়ার লিগে চলে যাই। ওই সিজনে আমি খেলাঘরের হয়ে ৬০০+ রান করি। তো সেই ম্যাচ শেষে শফিক ভাই, মিজান ভাই, রুহুল ভাই, উনারা আমাকে বলেছিলেন তোকে আমরা আগামী বছর প্রিমিয়ার লিগে আমাদের দলে নিবো। পুরো সিজন ভাল করার ফলে, উনারা আস্থা রেখে আমাকে পরের বছর (২০১৭) প্রিমিয়ার লিগ খেলার সুযোগ দেয়। ৩৮ বছর বয়সে এসে আমার প্রিমিয়ার খেলার স্বপ্নটা পূরন হয়েছিল খেলাঘরের কল্যানে।

নিউজক্রিকেট: আপনার ক্রিকেটের হাতেখড়ি কিভাবে? শৈশব জীবনের ক্রিকেটে, পরিবার ও পরিবারের বাইরের কোন মানুষ গুলোর ভূমিকা সবচাইতে বেশি, আজকের এই সালাউদ্দিন পাপ্পু হওয়ার পিছনে?

সালাউদ্দিন পাপ্পু: আমার বাবা আর্মিতে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে, আমাদের ক্যান্টনমেন্ট এরিয়াতেই থাকা হতো। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট খেলতাম টেপ টেনিস ও রাভার ডিউস বলে। একদিন আমাদের পাড়ার ক্রিকেটের একটি ম্যাচ ছিল সেনপাড়ায়। সেখানে সেই ম্যাচে ক্রিকেট বলে প্রেকটিস করতো, এমন বেশ কিছু ক্রিকেটারের বিপক্ষে খেলেছিলাম। ওই ম্যাচে আমি ঝড়ো একটা ইনিংস খেলি। ১৫ বলে ৬০ রান করি। আমার আক্রমনাত্মক ব্যাটিং দেখে, প্রতিপক্ষ দলের কয়েকজন এসে বলল, তুই ক্রিকেট বলের প্রেকটিস করিস না কেন? তোর যে স্কিল, তুই ক্রিকেট বলে প্রেকটিস করলেও ভাল করতে পারবি। তখন আমি বললাম, আমি তো ক্যান্টনমেন্ট এরিয়াতে থাকি, এখানে ক্রিকেট বলের প্রেকটিস করার কোন সুযোগ নেই। তখন তারা, আমাকে ওরা যেখানে প্রেকটিস করে সেখানে ওদের সাথে প্রেকটিস করতে বলে। এরপর আমি ওদের সাথে প্রথমবারের মতো ওদের একাডেমিতে ক্রিকেট বলে প্রেকটিস শুরু করি। সেখানে আমার কোচ ছিলেন বাবুল ভাই, চাঁদ ভাই। উনারা আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। এরপর বাবুল ভাই আমাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ঢাকায় এসে প্রথম বছর আমি দল পাইনি।আমি হাল ছাড়িনি, আমার মতো করেই অনুশীলন চালিয়ে গেলাম। পরের বছর উজ্জ্বল ভাইয়ের মাধ্যমে একটি দলে খেলার সুযোগ হয়। এইভাবেই শুরু হয় ক্রিকেটে আমার পথচলা। আর আমার পরিবার সবসময় আমাকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে ক্রিকেট খেলতে। আমার বাবা যেহেতু একজন ফুটবলার ছিলেন, তাই তিনি বুঝতেন স্পোর্টসম্যানের গুরুত্ব। উনারা কখনো আমাকে বাধা দেননি, সবসময় খেলতে দিয়েছেন। বলতে গেলে আমার এতটুকু আসার পিছনে আমার পরিবারের ভূমিকাও অনেক বেশি।

নিউজক্রিকেট: পেশাদার ক্রিকেটে আসার পর, বিশেষ করে ৩৮ বছর বয়সে লিস্ট-এ ক্রিকেটে আসার পর, কখনো কি জাতীয় দলের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখেছেন? বা এখনো কি দেখেন?

সালাউদ্দিন পাপ্পু: না, কখনো সেই স্বপ্নটা দেখিনি। যেটা পূরন হওয়ার নয়, এমন স্বপ্ন না দেখাই শ্রেয়। আমি শুধু এটাই চিন্তা করেছি সবসময়, আমি যতটুক সম্ভব খেলে যাবো। জাতীয় দল অনেক বড় ব্যাপার।। তাই এতবড় স্বপ্ন দেখার সাহস হয়নি। শুধুমাত্র আমার সহজাত ক্রিকেটটা খেলে গেছি আর ধ্যানজ্ঞান সব প্রিমিয়ারে ছিল।

নিউজক্রিকেট: আপনার ক্যারিয়ার সেরা ২-১ টা ম্যাচ ও ইনিংস সমন্ধে জানতে চাইবো, যেগুলো আপনার কাছে আজীবন স্মরনীয় হয়ে থাকবে।

সালাউদ্দিন পাপ্পু: আমি সবার আগে আমার প্রিমিয়ার লিগের প্রথম সেঞ্চুরিটাকেই রাখবো। প্রিমিয়ারে আমার দ্বিতীয় বছরে, কলাবাগানের হয়ে আমি আমার লিস্ট-এ ক্রিকেটের প্রথম সেঞ্চুরি পাই। ৩৯ বছর বয়সে এসে নিজের স্বপ্নের প্রিমিয়ার লিগে নিজের প্রথম শতক! ওই অনুভূতিটা আমার কাছে অনেক বেশি আনন্দের।  আর দ্বিতীয় স্মরনীয় কোন ম্যাচ বা মুহূর্তের কথা যদি বলতে যাই, তাহলে রংপুরে আমার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের একটি টুর্নামেন্টের ম্যাচের কথা বলি। তখন আমি ক্রিকেটটা মাত্র শুরু করলাম। রংপুরের একটা টুর্নামেন্টে ৪০ ওভারের একটা ম্যাচে, জয়ের জন্য আমাদের শেষ ৩ ওভারে প্রয়োজন ছিল ২৭ রান। ৯ উইকেট হারিয়ে বসেছিলাম আমরা। উইকেটে আমি ছিলাম। তো সেই ম্যাচে আমি ৮-৯ বলেই ২৬ রান তুলে ম্যাচটা জিতিয়ে ফেলি। সেই ম্যাচটার কথা আমার এখনো মনে পড়ে। সেই ম্যাচে আমি ম্যান অফ দ্যা ম্যাচও হয়েছিলাম।

নিউজক্রিকেট: শুনলাম রঙপুরে আপনার নিজের একটা ক্রিকেট একাডেমি আছে! সেই একাডেমি সমন্ধে যদি একটু ধারনা দিতেন?

সালাউদ্দিন পাপ্পু: হ্যাঁ রংপুরে তারা স্পোর্টস নামে আমার একটা ক্রিকেট একাডেমি আছে। সেখানকার হেড কোচ আছেন চাঁদ ভাই। ইকবাল ভাই নামেও একজন আছেন। উনারা দু’জনই আমার কোচ ছিলেন। আমার ওই একাডেমিতে সব বড় ছেলেপেলেরা অনুশীলন করে, যারা ঢাকামুখী হওয়ার চিন্তাভাবনা নিয়ে ক্রিকেট খেলছে। আলহামদুলিল্লাহ, আমার একাডেমির ৮-১০ ক্রিকেটার প্রতি সিজনেই ঢাকা লিগের বিভিন্ন ভাল ভাল দলের হয়ে খেলে যাচ্ছে। আর রংপুরেও প্রতিবছর যতগুলো টুর্নামেন্ট হয়, আমার একাডেমি সব গুলোতেই ফাইনাল খেলে আসছে।

নিউজক্রিকেট: ৪২-৪৩ বছর পার করেও আপনি এখনো তরুণ। ক্রিকেটটা আর কতদিন খেলতে চান? অবসরের পর আপনার পরিকল্পনা কি?

সালাউদ্দিন পাপ্পু: আমি আরো অন্তত বছর দুয়েক ক্রিকেট খেলে যেতে চাই। ওই যে শুরুতেই বললাম, পরিবারের জন্য হলেও ক্রিকেট খেলে যেতে হবে। এখনো এই মুহুর্তে ক্রিকেট ছাড়া অন্য কিছুর বিকল্প নেই। তাই শরির যদি আমাকে সাপোর্ট দেয়, আরো অন্তত দুবছর ক্রিকেট খেলবো।ক্রিকেট খেলা থেকে অবসরের পরও আমি ক্রিকেটের সাথেই থাকবো ইনশাআল্লাহ। ক্রিকেট বোর্ড থেকে লেভেল-ওয়ান কোচিং কোর্স করা আছে আমার। এছাড়া আম্পায়ার এসোসিয়েশন থেকেও আম্পায়ারিং কোর্স পাশ করা আছে আমার। তাই ক্রিকেট ছাড়ার পর কোচিং কিংবা আম্পায়ারিং থেকে সুবিধানুযায়ী একটা বেছে নিবো।

 

 

নিউজটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »