অদল-বদলে বাংলাদেশের নেপথ্য নায়কেরা!

নিউজ ক্রিকেট ২৪ ডেস্ক »

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বিশ্বকাপে প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করতে না পারা টিম টাইগার্সের কোচিং স্টাফে এসেছে পরিবর্তন। দায়িত্বে থাকা স্টিভ রোডসকে প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার অজুহাত দেখিয়ে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে। এমন ঘটনা নতুন না। গত ৯-১০ বছরে এদেশের ক্রিকেটের সাথে যুক্ত হয়েছেন অনেকেই। এই তালিকায় আছেন কিছু কিংবদন্তী ক্রিকেটাররাও। কিন্তু মাঠের পারফরমেন্স এর উপর ভিত্তি করে চাকরি হারিয়েছেন তারাও। চলুন একটু ঘুরে আসা যাক অতীতের দিনগুলো থেকে।

আজকের এই বদলে যাওয়া বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন হয়েছে ডেভ হোয়াটমোর আর জেমি সিডন্সের হাত ধরে। হারের বৃত্তে ঘুরতে থাকা বাংলাদেশকে জেতার প্রত্যাশা করতে শিখিয়েছিলেন ডেভ হোয়াটমোর। তখনকার অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমনের অবসর এবং হোয়াটমোরের চলে যাওয়া, আইসিএল কান্ড, এত কিছুর পর টাল-মাটাল বাংলাদেশের ক্রিকেট। অধিনায়কের দায়িত্ব উঠলো মোঃ আশরাফুলের কাঁধে। আর গুরু দায়িত্ব অস্ট্রেলিয়ান জেমি সিডন্সের কাঁধে। কিন্তু বারবার ব্যর্থ হওয়া আশরাফুল দিতে পারেন নি আস্থার প্রতিদান। নতুন অধিনায়ক ম্যাশ ইনজুরির কারণে ছিলেন যাওয়া আসার মিছিলে। তারপরই জুটি হয় সাকিব-সিডন্সের। আর এই জুটিই ব্যাকফুটে থাকা টাইগার শিবিরে একটু স্বস্তি নিয়ে আসে। কিন্তু কালের পরিক্রমায় পুরনো নিয়মে সিডন্সকেও হাঁটতে হয় বাড়ির পথে।

গত আট বছরে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল পেয়েছে ছয়জন হেড কোচ। কিন্তু তাদের কেউই এখন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারেন নি। জেমি সিডন্স, স্ট্রুয়ার্ট ল, রিচার্ড পাইবাস, শন জার্গেনসন, হাতুড়েসিংহে কিংবা স্টিভ রোডস সবাই যেমন এসেছেন আশার আলো ফুটিয়ে তেমনি বিদায়ও নিয়েছেন একদম নীরবে নিভৃতে। প্রশ্ন উঠতে পারে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সেরা হেডকোচ কে। কিন্তু এমন প্রশ্নের উত্তরে উঠে আসবে গভীর দীর্ঘশ্বাস। কেননা ছয় জনের কেউ কেউ নিজেকে প্রমাণ করার পর্যাপ্ত সময়টুকু পর্যন্ত পান নি। শ্রীলংকান হাতুড়েসিংহের সময়ে অধিনায়কের দায়িত্বে মাশরাফী। স্বপ্নের মত শুরু। অগোছালো টিম টাইগার্সকে এক সুতোঁয় বেঁধে ফেলা সম্ভব সেটা তাদের সময়েই প্রমাণ হয়েছে। মাঠের পারফরমেন্সও সেটাই বলে। জিম্বাবুয়ে সিরিজ দিয়ে শুরু, তারপর ১৫ বিশ্বকাপে কোয়াটার ফাইনাল নিশ্চিত করা, কি ছিলো না এই সময়ে। ব্যক্তিগত পারফরমেন্স ভুলে হুট করেই যেন বদলে গিয়ে টিম ওয়ার্কে বিশ্বাসী হতে শুরু করলো টিম টাইগার্স। পাকিস্তান, ভারত আর সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ জয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক আর কোচ একজন আরেকজনকে প্রশংসার সাগরে ভাসালেন। সব মিলিয়ে এ যেন এক দুর্বার বাংলাদেশ। ছোট ছোট স্বপ্নগুলো বড় হতে শুরু করলো। কিন্তু তখনই স্বপ্নের আকাশে ঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়া গেল। কোচ হাতুড়েসিংহের বিরুদ্ধে গুঞ্জন শোনা গেল অনেক। প্লেয়ারদের সাথে বিতর্কে জড়িয়ে যাওয়ার খবর উঠে আসলো। হুট করে ছুটিতে যাওয়া হাতুড়ে আর বাংলাদেশে আসারই প্রয়োজন মনে করলেন না। যখন ফিরলেন তখন তিনি নিজের দেশ শ্রীলংকার হোড কোচ।

এবারের বিশ্বকাপের কথা চিন্তা করে নিয়োগ করা হলো স্টিভ রোডস নামক এক ভদ্রলোককে। ইংলিশ এই কোচ কাউন্টি ক্রিকেটে নিয়মিত কোচিংয়ের সাথে যুক্ত থাকলেও আন্তর্জাতিক কোচিংয়ে এবারই প্রথম যুক্ত হলেন। বদলে যাওয়া টিম টাইগার্স হাতুড়ের বিদায়ের পরে আবারও একটু অগোছালো হয়ে পড়েছিল। আবারো পুরনো ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনতেই স্টিভ রোডসকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হলো। যেহেতু পরের বিশ্বকাপ ইংলিশ কন্ডিশনে তাই স্টিভ রোডসকে ছাড়া অন্য কাউকে চিন্তা করে নি বিসিবি। কারণ এই ভদ্রলোকের যে এমন কন্ডিশন একেবারে মুখস্থ। একটু সময় লাগলেও নিজের যোগ্যতার প্রমাণ তিনি করেছেন। তার হাত ধরেই প্রথম বারের মত বহুজাতিক কোন টুর্নামেন্টের শিরোপা জেতার স্বাদ পেল বাংলাদেশ। বিশ্বকাপেও শুরু হয়েছিলো স্বপ্নের মত। কোচ নিজেই বলেছিলেন এই বিশ্বকাপটা বাংলাদেশ স্মরণীয় করে রাখবে। কিন্তু সাম্প্রতিক পারফরমেন্স আর বিশ্বকাপের বাংলাদেশের মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া ছিলো অসম্ভব ব্যাপার। বোলিং আর ফিল্ডিং দেখে বুঝার উপায় নেই এটা বদলে যাওয়া বাংলাদেশ। এই ভদ্রলোককে নিয়েও উঠলো গুঞ্জন। সঠিক গেইম প্ল্যান তৈরিতে ব্যর্থ, ভাষাগত সমস্যা, প্লেয়ারদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ এসব নিয়েই বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়ে বারবার গুঞ্জন উঠেছে। আন্দাজ করা যাচ্ছিলো হয়তো বিশ্বকাপের পরেই নতুন কাউকে খুঁজবে বিসিবি। এমনটাই হলো। স্টিভ রোডস ফিরে গেলেন তার পুরনো ঠিকানায়। বাংলাদেশ হারালো তার আরেক অভিভাবককে।

পরিসংখ্যান বলে শ্রীলংকান হাতুড়েসিংহে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে সফল কোচ। তার সময়েই এসেছে সবচেয়ে বেশি সাফল্য। কিন্তু হোয়াটমোর, সিডন্স, ল, পাইবাস কিংবা জার্গেনশন কেউই চেষ্টার ত্রুটি করেন নি। হয়তো কোচিংয়ে ঘাটতি ছিলো কিন্তু দলে যে এখনের মত প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ আর অভিজ্ঞতা সম্পন্ন পরিণত ক্রিকেটার ছিলেন এমন কিন্তু না। সাকিব, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহরা নিজেরাই ছিলেন তরুণদের ভূমিকায়। সাকিব ছাড়া কেউই ছিলেন না অতটা প্রতিশ্রুতিশীল। তবে কেন শুধুই কোচিংয়ের ঘাটতিটা চোখে পড়বে?

বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন পর্যন্ত যত অভিভাবক পেয়েছে সবাই নিজেদের ক্যারিয়ার কিংবা কোচিং ক্যারিয়ারে সফল এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। বোলিং কোচ কোর্টনি ওয়ালশের কথাই যদি ধরি তার মত কিংবদন্তী পেস বোলারকে বাংলাদেশের বোলিং কোচ হিসেবে পাওয়া ছিলো একদম স্বপ্নের মত। তিনিও আসলেন কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছুই হলো না। কিন্তু এর মূল কারণটা জানার চেষ্টা না করেই আমরা তাদেরকে বিদায় জানাতে বেশ পারদর্শী।

টাইগারদের নতুন পেস বোলিং কোচ হয়েছেন সাউথ আফ্রিকার পেস বোলার শার্ল ল্যাঙ্গেভেল্ট, স্পিন বোলিং কোচ ড্যানিয়েল ভেট্টরি বাকি রইলেন হেডকোচ। চলছে হেড কোচ নিয়েও আলোচনা। আসবেন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন নতুন কেউ। প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে চুক্তির মেয়াদ থাকতেই হয়তো বিদায় জানানো হবে তাদেরকেও। কিন্তু এই নেপথ্য নায়কেরা কি পর্যাপ্ত সময়ের দাবি রাখেন না?

  • দুর্জয় দাশ গুপ্ত
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
নিউজটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »