বঙ্গদেশের প্রথম সুপারস্টারের জন্মদিন

মেহেদী মুরাদ »

সালটা ২০০১ তারিখ ৬ই সেপ্টেম্বর, কলম্বোতে খেলতে নামলো ১৭ বছরের ছোটো-খাটো গড়নের এক বিস্ময় বালক। যার কিনা ওই বয়সে খেলার কথা পাড়ার ক্রিকেট মাঠে কিংবা গলির ক্রিকেটে সেই কিনা খেলছে জাতীয় দলের টেস্ট দলে। বলছিলাম আশরাফুলের কথা, দর্শক থেকে শুরু করে লঙ্কান দলের খেলোয়াড় সবাই হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে এই বালকের দিকে।অভিষেক টেস্টের প্রথম ইনিংসটি খুব বেশি সফলতা পাননি বলায় যায়, ২৬ রান করেই আউট। তবে তাচ্ছিল্যের জবাবটা দিতে বেশি সময় নেয়নি তিনি। দ্বিতীয় ইনিংসে হাতের ব্যাটকে কলম বানিয়ে লিখে ফেললেন এক মহাকাব্য। হালের চামিন্দা ভাস থেকে শুরু করে মুরালিধরনের বলকে শাসনে রেখে করে ফেললেন ১১৪ রান। আর এই শতক তাকে এনে দিলো সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট শতকের মুকুট। যে মুকুট এখন অবধিও রয়েছে তাঁর দখলেই।

কার্ডিফ, গায়ানা বা জোহানেসবার্গ অ্যাশের একেকটা ইনিংস যেন একেকটা দৈত্য বধের গল্প। নিজের দিনে তার উইলো থেকে আসা প্রতিটি শট জন্ম দিতো নান্দনিক ইনিংসের। যে ইনিংসের উপর চেপে বাংলাদেশ পেয়ে যেত “বিজয়ী” বিশেষণের কাঙ্খিত সোনার হরিণটি। বাংলাদেশর ক্রিকেট ইতিহাসে বহু “প্রথমের” কারিগর অ্যাশ নিজেই। পরিসংখ্যানে চোখ বুলিয়ে দেখে নেওয়াই যায় কারণ তিনি যে লাল-সবুজের প্রথম সুপার-স্টার।

★২০০৫ সালে কার্ডিফ রূপকথার জন্ম দিয়ে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর ম্যাচে আশরাফুল করেছিলেন ১০০ রান।

★২০০৬ সালে বগুড়ায় প্রথমবার শ্রীলংকাকে পরাজিত করার ম্যাচে অ্যাশের সংগ্রহ ছিল ৫১ রান।

★২০০৮ সালে মিরপুরে নিউজিল্যান্ডকে প্রথমবার পরাভূত করার ম্যাচে অ্যাশ করেছিলেন অপরাজিত ৬০ রান।

★২০০৯ সালে ডোমিনিকায় উইন্ডিজকে প্রথমবার হারানোর ম্যাচে আশরাফুল করেন ৫৭ রান।

★২০০৭ সালের বিশ্বকাপে গায়ানায় প্রথমবার দক্ষিণ আফ্রিকাকে পরাজিত করার ম্যাচে অ্যাশের সংগ্রহ ছিল ৮৭ রান।

★২০০৪ সালে হারারেতে জিম্বাবুয়েকে প্রথমবার পরাভূত করার ম্যাচে অ্যাশের ব্যাট থেকে আসে ৫১ রান।

★২০০৮ সালে লাহোরে আরব আমিরাতকে প্রথমবার হারানোর ম্যাচে অ্যাশের সংগ্রহ ছিল ১০৯ রান। এগুলোর সবই ছিলো উপরিউক্ত দলগুলির বিপক্ষে “ওডিয়াই”ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম জয়ে আশরাফুলের অবদান গাঁথার কথা। এছাড়াও

★২০১৩ সালে গলে প্রথমবারের মতো শ্রীলংকার বিপক্ষে টেস্ট ড্র করে বাংলাদেশ। যেখানে প্রথম ইনিংসে আশরাফুল করেন ১৯০ রান।

★২০০৭ সালে উইন্ডিজকে টোয়েন্টিতে প্রথমবার হারানোর ম্যাচে অ্যাশ করেন ৬১ রান।

এমনকি ক্রিকেটের তিনটি সংস্করণেই বাংলাদেশের হয়ে দ্রুততম ফিফটি করার কৃতি এখনো এই লিটল জুনিয়রের দখলে রয়েছে।

*২০০৭ সালের মিরপুর টেস্টে ভারতের বিপক্ষে অ্যাশের করা ২৬ বলের অর্ধশতক এখনো পর্যন্ত ভাঙতে পারেনি এদেশের কোন ব্যাটসম্যান।

*২০০৫ সালে ট্রেন্ট ব্রিজে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তারই করা ২১ বলের ফিফটি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশীদের ভিতর উচ্চতম স্থানেই রয়েছে।

*২০০৭ সালে জোহানেসবার্গে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ২০ বলে করা অর্ধশতকটি এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশী হিসেবে সেরার কাতারে রয়েছে।

অ্যাশের ক্যারিয়ারের শুরুটা যেভাবে সোনালী স্বপ্নের জানান দিয়েছিল সময়ের পরিক্রমায় তিনি সে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেননি। আলো-আঁধারের মিশেলে সমন্বিত ক্যারিয়ারটিতে আঁধারই যেন সঙ্গী হয়েছে বেশি। তবে ওই যে নিজের দিনে ব্যাটকে তলোয়ার বানিয়ে বিশ্বের নামকরা বোলারদেরকে শাসন করেছেন অবলিলায়,স্বমহীমায়। পরিসংখ্যান দেখলে এরকম উদাহরণ মিলবে ভরি-ভরি। এক ধারাভাষ্যকার আপন ভাষাতে বলেছিলেন অ্যাশ বাংলার ক্রিকেটের ‘আশার ফুল’। যেদিন তার ব্যাট ‘আশার ফুল’ ফুটিয়ে চারিদিক সুবাশিত করবে, সেদিন বাংলার জয়রথ থামানোর মতো পরাক্রমশালী যে কেউ নেই।

আজও অনেক ক্রিকেট ভক্ত স্বপ্ন দেখেন অ্যাশ জাতীয় দলে ফিরবে। আবারও বুক চিঁতিয়ে লড়বে এদেশের জার্সি গায়ে। আবারও দেখা মিলবে তাঁর ব্যাট থেকে ক্লাসিক এবং নান্দনিকতায় ভরপুর ক্রিয়েটিভ শটগুলি। কোটি ভক্তের দোয়া অ্যাশকে ঠিকই আবার ফিরিয়ে আনবে জাতীয় দলে এটাই কামনা।

শুভ জন্মদিন প্রিয় অ্যাশরাফুল। ১৯৮৪ সালের আজকের দিনে ঢাকাতে জন্মগ্রহণ করেন বাংলার ক্রিকেটের প্রথম পোস্টারবয়।

নিউজটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »